একটি ফোনকল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একজন বলছেন, ‘আমার আব্বা করোনার সময় মারা গেছেন। আব্বা মৃত্যুর আগে শেষ যে খাবারটি খেয়েছিলেন, সেটি ছিল ‘এন’স কিচেন’‑এর তৈরি। সামনের মাসে আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের পরিবারের একান্ত চাওয়া, আব্বার মৃত্যুবার্ষিকীর খাবার যেন ‘এন’স কিচেন’ তৈরি করে।’ ...একজন রন্ধনশিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না।
খাদ্যবিষয়ক উদ্যোক্তা ফাতেমা আবেদীন (নাজলা)। তিনি এন’স কিচেন‑এর কর্ণধার ও একজন রন্ধনশিল্পী। এন’স কিচেন‑এর নাম নাজলা নামের প্রথম অক্ষর ‘এন’ দিয়ে শুরু। কিন্তু বর্তমানে তাঁর স্বামী আর মেয়ের নামও ‘এন’ দিয়ে শুরু। নাজলা, নয়ন আর নিহিরা।
২০২০ সালে এন’স কিচেন’‑এর যাত্রা শুরু। এরপর থেমে নেই পথচলা। চার বছরের মধ্যে ধানমন্ডির নিরিবিলি পরিবেশে তৈরি করেছেন ‘ইন ডাইন রেস্তোরাঁ’। এখানে যারা খেতে আসেন, তারা ইন ডাইন রেস্তোরাঁয় বাড়ির পরিবেশে আরাম আয়েশে তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেন।
ফাতেমা আবেদীন তাঁর উদ্যোক্তা জীবনে দেখেছেন করোনাকাল। আবার দেখেছেন ২০২৪ সালের দেশের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। এই দুই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে কোনটি উদ্যোক্তাদের জীবনে সংকট তৈরি করেছে, তা জানতে চাইলে জুলাই‑আগস্টের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটের বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে খাবারের ব্যবসা চালু করার পরপরই করোনা চলে আসে। এ সময় আমরা বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন শুরু করি। কারণ টাকার মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার একটা বিষয় ছিল। করোনাকালে আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা ছিল, করোনাকালে আমাদের ক্রেতা ছিল। অনলাইনে কিছুটা হলেও ব্যবসায়িক লেনদেন করা গেছে। করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকট ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা যোগাযোগের অভাবে অনেক বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।’
খাবার মানুষ আনন্দ নিয়ে খেয়ে থাকে। খাবারের ক্ষেত্রে একটা মানসিক প্রশান্তিরও বিষয় থাকে। ভোজনরসিকেরা সেই আনন্দ পেতে যান এন’স কিচেনে। কারও বাড়িতে অতিথি গেলে যেভাবে খাবার পরিবেশন করা হয়, এন’স কিচেনে ঢুকলে তারাও সেই পরিবেশ খুঁজে পান। এখানে বুকিং দিয়ে খেতে আসতে হয়। তবে যে কেউ এসে চা‑কফি চাইলে খেতে পারেন। আবার টুকটাক নাস্তাও করতে পারেন। কিন্তু একটু আরাম আয়েশে খেতে চাইলে, আসার এক ঘন্টা আগে পেজের ইনবক্সে বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফোন নম্বরে বুকিং দিয়ে আসতে হয়।
বুকিং দিয়ে এলে এখানকার কর্মীরা একটু আরামে খাবার রান্না ও পরিবেশনের সময় পান। এর কারণ হিসেবে এন’স কিচেন‑এর কর্ণধার নাজলা বলেন, ‘আমরা চাই না বাড়তি খাবার নষ্ট হোক বা ফেলে দেওয়া হোক। আমরা একগাদা খাবার রান্না করে রেখে দিতেই পারি। ২০ রকমের খাবার রান্না করে রেখে দিলাম। আর গ্রাহকেরা এসে যে যার পছন্দ মতন খেলেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু এতে অনেক খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার নষ্ট না হয়ে খাবারটা যদি জমা থাকে, তাহলে খাবারটা পরদিন দিতে হবে। আমরা এভাবে পুরোনো খাবার দিতে চাই না।’
নাজলা বলেন, ‘এরপর দেশে ফিরে সাংবাদিকতা শুরু করি। ২০১৪ সালে হাতের কাজের শাড়ির ব্যবসা শুরু করি। ২০১৯ সালে দেশে ডেঙ্গু মহামারি আকার নেয়। এ সময় আমার আশপাশের অনেকেই মারা যান। মনে মনে ভাবি, শাড়ি বা পোশাক মনের আনন্দ বা উৎসব ছাড়া পরা যায় না। তবে, প্রয়োজন আলাদা জিনিস। মনে আনন্দ না থাকলে পোশাক কেনা হয় না। তাই শাড়ির ব্যবসা থেকে সরে আসি। এরপর করোনাকাল এল। চালু হলো হোম অফিস। হোম অফিস করতে করতে একটা সময় মনে হলো, ফুলটাইম রান্নাবান্নায় সময় দেব। ফলে ক্যারিয়ারের পিক টাইমে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে রান্নাবান্নার দিকে মনোযোগ দিই।’
নাজলার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল, একটা ভাতের হোটেল দেওয়ার। যেখানে মানুষজন নিজের বাড়ির মতো আরাম‑আয়েশে তৃপ্তি নিয়ে খাবেন। এ ক্ষেত্রে বিভূতিভূষণের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ আর শ্রীলংকার লেখক রমেশ গুনেসেকেরা গল্প ‘খোলস’ তাঁর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
তবে খাদ্যবিষয়ক উদ্যোক্তা হবেন–এই মনোবল তাঁর একদিনে তৈরি হয়নি। এর জন্য দীর্ঘদিন সময় লেগেছে। ২০২০ সালে অনলাইনে যাত্রা করে ‘ইন ডাইন’ রেস্তোরাঁয় আসতে চার বছর সময় লেগেছে। এখান থেকে এ পর্যন্ত যারা খাবার নিয়েছেন বা খেয়েছেন, তাঁরা কেউ কোনোদিন বলেননি, ‘এখানকার খাবার সতেজ বা ভালো না।’ আবার এখানকার খাবার খাওয়ার পর কারও গলা জ্বলা বা অ্যাসিডিটির সমস্যা হয়নি। কারণ, তেল ও হাইজিনের বিষয়ে এখানে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না।
এন’স কিচেন‑এ বর্তমানে কর্মী আছেন ১৩ জন। এর মধ্যে তিনজন বাইরে থাকেন। বাকি ৮ জনের জন্যে যে বাসা ভাড়া নেওয়া আছে, তাঁরা সেখানে থাকেন। কর্মীদের খাবারের ব্যবস্থাও এখান থেকে করা হয়। দুজন ম্যানেজার আছেন। এখানে পেজ ম্যানেজার আছেন তিনজন, যারা অনলাইনের বিষয়টা দেখেন। সকাল ৮টা থেকে কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ডাইনিং এ খেতে আসা যায় দুপুর একটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। এখানে বইয়ের কর্ণার আছে। কেউ খেতে এসে যদি বই পড়তে চান, তাহলে নিরিবিলি পরিবেশে বই পড়তে পারেন। এখানে মোবাইল দেখার চাইতে বই পড়াকে সবসময় উৎসাহিত করা হয়।
বর্তমানে এন’স কিচেন দেশি ভর্তা, ভাজি থেকে শুরু করে রোস্ট, পোলাও, খিঁচুড়ি বা কাচ্চি বিরিয়ানিও পাওয়া যায়। নাজলা প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য আনেন। সেই খাবারে থাকে দেশীয় ও আঞ্চলিক খাবার। বর্তমানে এন’স কিচেন থেকে একই সময়ে ১৫০০ মানুষের খাবার দেওয়া যায়। সামনের বছর মাইডাস সেন্টারে এন’স কিচেন‑এর উদ্যোগে একটি মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। মেলাতে বিভিন্ন উদ্যোক্তার পণ্য যেমন থাকবে, তেমনি শিশুদের জন্য একটা কর্ণার থাকবে।