পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে পাহাড়ের মেয়ে মনিকা চাকমা জয় করলেন হিমালয়। গত বুধবার কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জমজমাট ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়েছে মনিকারা। ম্যাচের ৫২তম মিনিটে প্রথম গোলটি দিয়েছিল খাগড়াছড়ির মেয়ে মনিকা চাকমা। জয়ের খবরে সেদিন রাতে তাঁর গ্রাম খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়িতে ছড়িয়ে পরে জয়ের আনন্দ।
খাগড়াছড়ির দুর্গম উপজেলা লক্ষীছড়ির সুমান্ত পাড়ায় মনিকা চাকমার বাড়ি। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে রাত ৯টা বলতে গেলে গভীর রাত। মোবাইল ফোনে কথা হয় সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে, সবার কণ্ঠে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ তাদের কিছুটা বেশি। কারণ, নিজ গ্রামের মেয়ে মনিকার গোলে দেশের বড় জয়।
সুমান্ত পাড়ার বাসিন্দা কিরণজয় চাকমা ও কুহেলি চাকমা বলেন, ‘এর আগেও মনিকা চাকমা বাংলাদেশকে জিতিয়েছে। টানা দ্বিতীয়বারের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নে আমাদের মেয়েরা জয় এনেছে। আমাদের খুব গর্ব হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল মনিকা গোল করবে, তা সত্যি হলো।’
মনিকার ফুটবলার হওয়ার পথচলা সহজ ছিল না। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া মনিকার উত্থান ছিল অনেকটা গল্পের মতো। লক্ষীছড়ির দুর্গম গ্রাম সুমন্ত পাড়ায় মনিকার জন্ম। সেখানে ছিল না বিদ্যুৎ, চলাচলের জন্য নেই সড়ক যোগাযোগ। কৃষক বাবা বিন্দু কুমার চাকমা ও রবি মালা চাকমার পাঁচ মেয়ের মধ্যে মনিকা সবার ছোট। মেয়ে ফুটবল খেলবে মনিকার বাবার তা পছন্দ ছিল না। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পাড়ার ফুটবল খেলায় অংশ নিতেন মনিকা।
২০১০ সালে উপজেলার মরাচেঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে প্রথম বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলেন তিনি। ২০১২ সালে চট্টগ্রামে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলতে গেলে রাঙামাটি মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিরসেন চাকমার নজরে আসে। তিনি মনিকাকে রাঙামাটির মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেন। মনিকা ২০১৩ সালে স্কুলটির হয়ে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলে জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হন।
মনিকার বাবা বিন্দু কুমার চাকমা ও মা রবি মালা চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় ছোট্ট মনিকার ফুটবলের প্রতি টান বাবা-মা হিসেবে প্রথমে মেনে নিতে পারিনি। এ জন্য প্রায় সময় মারও খেতে হয়েছিল ওকে। কিন্তু আমরা এখন মনিকাকে নিয়ে গর্বিত। ফুটবল খেলার মাধ্যমে মনিকা এখন সারা দেশে এলাকার সুনাম বাড়িয়েছে। সে এবারও বাংলাদেশকে জিতিয়ে এনেছে। খুব আনন্দ হচ্ছে আমাদের।’
লক্ষীছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীর কুমার চাকমা জানান, দুর্গম পাহাড় থেকে জাতীয় পর্যায়ে আগেই আলো ছড়িয়েছেন মনিকা। একজন মেয়ে হয়ে শত বাধা ডিঙিয়ে ফুটবলশৈলীর মাধ্যমে জাতীয় দলে জায়গা করে নেয় দুর্গম পাহাড়ি জনপদে জন্ম নেওয়া মনিকা। এরপরই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল মনিকা চাকমার নাম।
বাংলাদেশের এমন জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান। তিনি জানান, মনিকা চাকমাকে জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।