৭২ দিনে পুরো বিশ্ব ঘুরেছিলেন তিনি!

নারী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বলা হয় তাঁকে। তবে মানুষের মাঝে তিনি অধিক পরিচিত পরিব্রাজক হিসেবে। মাত্র ৭২ দিনে পৃথিবী ঘুরে এসে চমক সৃষ্টি করেছিলেন নেলি ব্লাই!

১৮৬৪ সালে পেনসিলভেনিয়া পিটসবার্গের শহরতলিতে জন্ম নেলির। প্রকৃত নাম এলিজাবেথ কোচরান।

স্থানীয় এক পত্রিকা প্রায়ই নারীবিদ্বেষী সংবাদ প্রকাশ করত। তাই নেলি সেখানে ছদ্মনামে লেখা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁর ভাষা-দক্ষতা দেখে পত্রিকার সম্পাদক নেলির পরিচয় উদ্‌ঘাটনে নেমে পড়েন। সে সময় নেলির বয়স মাত্র ২১ বছর! এভাবেই ১৮৮৫ সালে লেখালেখির মাধ্যমে নেলির কর্মজীবন শুরু।

শৈশবে নাকি গোলাপি রঙের পোশাক পরতে ভালোবাসতেন নেলি। পরিচিতরা তাই তাঁকে ডাকতেন ‘পিঙ্ক’ নামে। সেই পিঙ্ক-ই বড় হয়ে তুখোড় সাংবাদিকে পরিণত হন; এমন একজন সাংবাদিক যিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক ধাপ এগিয়ে ছিলেন।

প্রথম নারী যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবেও ভূমিকা রয়েছে নেলি ব্লাইয়ের। ছবি: সংগৃহীতখ্যাতিমান হাঙ্গেরীয়-মার্কিন সাংবাদিক জোসেফ পুলিৎজারের সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের অফিসে নিয়োগ পান নেলি ব্লাই। অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে ব্ল্যাকওয়েলস আইল্যান্ড নামের একটি দ্বীপে থাকা মানসিক রোগবিষয়ক চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে খবর সংগ্রহ করতে বলা হয় নেলিকে। এই খবর উদঘাটনের জন্য তিনি যে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেন, তা সাংবাদিকতার ইতিহাসেই অবিস্মরণীয়।

নেলির এডিটর তাঁকে বলেছিলেন, তিনি যেন দশ দিন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট করেন। এজন্য রীতিমতো ‘পাগল’ সেজে নেলি ব্লাই মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের সঙ্গে সেই চিকিৎসাকেন্দ্রে অবস্থান করেন।

আরেক দফা ছদ্মনাম ধারণ করে তিনি ব্ল্যাকওয়েলস আইল্যান্ডের এক বোর্ডিং হাউজ ভাড়া করেন। এরপর বিভিন্নভাবে নিজেকে মানসিক রোগী প্রমাণ করতে শুরু করেন নেলি। পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারক এবং চিকিৎসকের দ্বারা মানসিক রোগী হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পরই নেলির ঠাঁই হয় ব্ল্যাকওয়েলস দ্বীপে।

নেলি গিয়ে সেখানে রোগীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। নেলি দেখতে পান, রোগীদেরকে কীভাবে জোর করে বরফ-পানিতে গোসল করিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেজা পোশাকে রেখে দেওয়া হয়। কাউকে কাউকে টানা বারো ঘণ্টা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হত। অবাক বিস্ময়ে নেলি টের পান, এখানকার রোগীদের একটা বড় অংশ আসলে রোগীই নন! জোর করে তাঁদের বন্দী করে রাখা হয়েছে।

নিজ চোখে দেখা এসব অভিজ্ঞতা পরে বই আকারে প্রকাশ করেন নেলি ব্লাই, নাম দেওয়া হয় ‘টেন ডেইজ ইন আ ম্যাড-হাউস’। মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রের বহু নারীর জীবন বদলে যায় নেলির এই লেখা প্রকাশের পর।

জুল ভার্নের লেখা কল্পবিজ্ঞানবিষয়ক বই ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন নেলি। এই বইয়ের চেয়েও কম সময়ে বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা আঁটেন তিনি। সে অনুযায়ী পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে এ কাজের জন্য অনুমতি চান।

নেলি ব্লাইয়ের বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীতকিন্তু শোনা যায়, কর্তৃপক্ষ প্রথমে এ প্রস্তাবে সায় দেয়নি। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জন অ্যা কোকেরিল নেলিকে বলেছিলেন, ‘তুমি একজন নারী, এ কাজে তাই তোমার একজন অভিভাবক লাগবে। আবার তুমি একা গেলে বিশাল একটি স্যুটকেসের ভারও তোমাকে একাই বহন করা লাগবে। পৃথিবী ঘুরে আসা সহজ কোনো কম্মো নয়! এটা শুধু একজন পুরুষই পারবে, আর কেউ নয়।’ নেলি নাকি তখন হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তেমনটা হলে অন্য পত্রিকায় চলে যাবেন তিনি!

১৮৮৯ সালের শেষের দিকে বিশ্বভ্রমণ শুরু করেন নেলি ব্লাই। ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর থেকে জাপান এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পূর্ব উপকূল—এই পুরো পথ তিনি অতিক্রম করেছিলেন মাত্র ৭২ দিন ৬ ঘণ্টা ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে! সতি সত্যিই জুল ভার্নের কল্পনাকে হার মানাতে সক্ষম হন নেলি।

প্রথম নারী যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবেও ভূমিকা রয়েছে নেলি ব্লাইয়ের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সার্বিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনকারী প্রথম নারী ছিলেন তিনি। ১৯২২ সালে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটে এই অগ্রদূতের।

তথ্যসূত্র: এনওয়াই হিস্ট্রি, ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস