যে নারী বৈমানিক একা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন

প্রথম নারী বৈমানিক হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সর্বোচ্চ গতিতে বিমান চালানো ও বৈমানিক হিসেবে সলো ফ্লাইটের হিসাবে করেন রেকর্ড, পান ‘কুইন অব এয়ার’ তকমা।

বিমান নিয়ে ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠা দুর্বার সাহসী এই কিংবদন্তি নারী বৈমানিককে দেখে পরবর্তীতে বহু নারী আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেন। নাম তাঁর অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট।

১৮৯৭ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম অ্যামেলিয়ার। মা-বাবার প্রশ্রয়ে শৈশব থেকেই দুরন্ত হয়ে ওঠেন অ্যামেলিয়া।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে নিয়োজিত হন অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। কানাডার টরন্টোতে আহতদের সেবার জন্য শুরু করেন নার্সের কাজ।

যে নারী বৈমানিককে দেখে পরবর্তীতে বহু নারী আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেন। ছবি: সংগৃহীতবিমানের প্রতি ভালোবাসার গল্পের শুরুটা সেখানেই। যুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধবিমানের প্রদর্শন হত, অবসর সময়ে সেগুলোই দেখতে যেতেন অ্যামেলিয়া।

তবে আকাশে ওড়ার বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয় আরেকটু পরে। ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন অ্যামেলিয়া। প্রশিক্ষণ চলাকালীন টাকা জমাতে শুরু করেন। ঠিক ছয় মাসের মাথায় জমানো টাকায় এয়ারস্টারের দুই আসনের একটি পুরাতন বিমান কিনে ফেলেন অ্যামেলিয়া। হলুদ রঙের সেই বিমানের নাম দিয়েছিলেন 'দ্য ক্যানারি'।

যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণভাবে মনে করা হতো যে বিমানের ককপিট নারীদের জন্য নয়। কর্মক্ষেত্রে নারীদের বিচরণ শুরু হলেও কর্তৃত্ববাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেননি তাঁরা।

কিন্তু অ্যামেলিয়া সামাজিক কোনো ট্যাবুকেই তোয়াক্কা করেননি। তিনি ঠিকই তাঁর ক্যানারিতে চেপে আকাশের এক সীমানা থেকে আরেক সীমানায় দাপিয়ে বেড়ান।

বৈমানিক, লেখক, নারীবাদী অ্যাকটিভিস্ট- একাধিক পরিচয় ছিল অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের। বিমান চালনার পাশাপাশি সরব ছিল তাঁর কলমও; লিখেছেন নারীদের বিমান চালানোর পক্ষে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব উইমেন পাইলটস নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন অ্যামেলিয়া।

১৯৩৭ সালে বিমানে চেপে গোটা পৃথিবী প্রদক্ষিণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ৩৯। সঙ্গী ছিলেন বন্ধু নাবিক ফ্রেড নুনান। ২১ মে ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করেন তাঁরা। ৪০ দিনে মোট ২০ জায়গায় যাত্রা বিরতি নেন দুই অভিযাত্রী। শোনা যায় করাচি, কলকাতায় অবতরণ করে তাঁরা বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

ফ্রেড নুনানের সঙ্গে পৃথিবী প্রদক্ষিণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। ছবি: সংগৃহীত২ জুলাই সকালে সফরের সবচেয়ে কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করেন। খারাপ আবহাওয়ায় আচমকাই অ্যামেলিয়াদের বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেউ বলেন, পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন অ্যামেলিয়ারা। আবার কারো ধারণা, প্রশান্ত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়ে যায় তাদের বিমান। আবার কারো মতে, জাপানের দ্বীপে অবতরণ করেছিল অ্যামেলিয়ার বিমান; সেখানে তাঁকে আমেরিকার চর ভেবে আটক করে নেয় জাপানি সেনারা।

এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল তখন। এরপর পেরিয়ে গেছে আট দশক; আজও ইয়ারহার্ট ও নুনানের অন্তর্ধান রহস্য ভেদ করতে পারেননি কেউ!

পরবর্তীতে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টকে নিয়ে লেখা হয়েছে বিভিন্ন বই; তৈরি হয়েছে একাধিক সিনেমা।

তথ্যসূত্র: অ্যাডভেঞ্চার জার্নাল ডট কম