নির্যাতিত নারী কি সরাসরি মামলা করতে পারেন?

এ দেশে নারীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারী নির্যাতন মানে, যা নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হয় এবং নারীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করে। এ দেশে ঘরে–বাইরে, পথেঘাটে ও অফিস-আদালতে নারীরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক প্রতিবেদন (জানুয়ারি) থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মোট ৮৫ জন কন্যা এবং ১২০ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪২ জন কন্যাসহ ৬৭ জন। তার মধ্যে ১৪ জন কন্যাসহ ২০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ১ জন কন্যাসহ ২ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ২ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

এ ছাড়া মহিলা পরিষদের তথ্য মতে,গত জানুয়ারি মাসে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৮ জন। উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে ৩ জন, এর মধ্যে ১ জন কন্যা। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ জন। আবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ২১ জন, এর মধ্যে ২ জন কন্যা। ২ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে ১ জন গৃহকর্মীর হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

প্রশ্ন হলো নির্যাতিত নারীরা কি আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। হ্যাঁ, নির্যাতিত নারী সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন। দেশে প্রচলিত সাধারণ আইনসমূহে বর্ণিত কোন নির্যাতনের শিকার হলে একজন নারী প্রাথমিকভাবে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানাতে পারেন অথবা সরাসরি সংশ্লিষ্ট আমলী আদালতে গিয়েও মামলা দায়ের করতে পারেন। আর যদি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ কোন আইন, যেমন- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর মতন কোন আইনে বর্ণিত নির্যাতনের শিকার হন তাহলে নির্যাতিতা নারী শুরুতে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানাবেন, থানা অভিযোগ না নিলে বা কোন কারণে নিতে অস্বীকার করলে অভিযোগকারী নারী সে মর্মে একটি হলফনামা দাখিল করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

বাংলাদেশে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতনের ক্ষেত্রে সাধারণত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) -এর ধারা ১১-এর (ক), (খ), (গ) অনুযায়ী এবং যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ধারা ৩ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়ে থাকে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ধারা ১১ অনুযায়ী যদি কোন নারীর স্বামী অথবা স্বামীর পিতা, মাতা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষে কোন ব্যক্তি যৌতুকের জন্য উক্ত নারীর মৃত্যু ঘটান বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করেন কিংবা উক্ত নারীকে মারাত্মক জখম (grievous hurt) করেন বা সাধারণ জখম (simple hurt) করেন তাহলে উক্ত স্বামী, স্বামীর পিতা, মাতা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষের কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্যাতনের শিকার কোন নারী নিজে বা যেক্ষেত্রে নারীটি নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, সেক্ষেত্রে অন্য কেউ মামলা দায়ের করতে পারেন। এই আইনে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান আছে।

এ ছাড়া যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ৩ ধারা অনুযায়ী, যৌতুক প্রদান, গ্রহণ বা গ্রহণে সহায়তা অপরাধ। স্বামী বা তার পরিবারের সদস্যরা স্ত্রী বা তার পরিবারের কাছে যৌতুক দাবি করলে বা এর জন্য নির্যাতন করলে আইনের এই ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। এই আইনে নির্ধারিত শাস্তি মূলত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হিসেবে প্রযোজ্য।

ঘরোয়া সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ পরিবারের মধ্যে যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নির্যাতিত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেয়।

তাই, যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করতে চান, তাহলে তিনি প্রথমে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করতে পারেন। এ সময় নির্যাতনের সব প্রমাণ, যেমন- মেডিকেল রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি ইত্যাদি জমা দিতে হবে। থানায় অভিযোগ না নিলে বা সুষ্ঠু তদন্ত না হলে সরাসরি আদালতে বা ট্রাইব্যুনালে মামলা করা যেতে পারে।

এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন আইনি সহায়তা সংস্থা, যেমন- আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), জেলা লিগ্যাল এইড অফিস ইত্যাদি থেকেও আইনি পরামর্শ ও সহায়তা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট