বাংলাদেশে অপ্রাপ্ত বয়সের ধর্ষকের বিষয়ে আইন একটি জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়। “অপ্রাপ্তবয়স্ক” বলতে সাধারণত ১৮ বছরের নিচের বয়সের কাউকে বোঝানো হয়। এদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিচার ও শাস্তির প্রক্রিয়া ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়, কারণ এটি শিশু আইন ও ফৌজদারি আইন—উভয়ের অধীন পড়ে।
প্রথমত, বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো ব্যক্তি “শিশু” হিসেবে বিবেচিত হয়। এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো শিশু যদি কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হয়, তবে তার বিচার হবে বিশেষ শিশু আদালতে। এই আদালতের মূল উদ্দেশ্য শাস্তির পরিবর্তে সংশোধন ও পুনর্বাসন। তবে এর অর্থ এই নয় যে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শাস্তি থেকে রেহাই পাবে। আদালত শিশু অভিযুক্তের বয়স, মানসিক অবস্থা, অপরাধ সংঘটনের পরিস্থিতি, এবং সংশোধনের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়।
দ্বিতীয়ত, ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী বিচার হয়। এই আইনে ধর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নির্ধারিত আছে। তবে যদি ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন শিশু হয়, তাহলে আদালত শিশুর বয়স ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করে। শিশু আইনের বিধান অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী অপরাধীকে সাধারণত সংশোধনাগারে পাঠানো হয় এবং তাকে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে একই পদ্ধতিতে কারাবন্দি রাখা হয় না।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এ বিষয়ে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে—একদিকে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তের সংশোধন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনা করা।
তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর বয়স যাচাই, সঠিক তদন্ত, এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় বয়স প্রমাণের অভাবে একজন শিশু অভিযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিচারভুক্ত হয়। তাই এসব ক্ষেত্রে সঠিক জন্ম নিবন্ধন ও তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অপ্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষকের বিষয়ে বাংলাদেশের আইন মূলত দুটি দিককে গুরুত্ব দেয়—ন্যায়বিচার এবং সংশোধন। এ ধরনের মামলায় শুধু আইন নয়, সমাজ ও পরিবারের ভূমিকা, শিক্ষা এবং সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিশু অপরাধীরা অনেক সময় নিজেদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার শিকার হয়। তাই আইনের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করাও সময়ের দাবি।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট