আত্মহত্যা কি জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হতে পারে?

এ কথা ঠিক যে, আমরা শারীরিক অসুস্থতার কারণে যতটা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। মনের অসুস্থতায় ঠিক ততটা উদ্যোগ নিই না। তাই মানসিক স্বাস্থ্য কিছুটা অযত্নে পড়ে থাকে। কিন্তু শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে চাইলে মনেরও যত্ন প্রয়োজন।  মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের অবহেলা অনেক সময় বড় কোনো অঘটনের মধ্য দিয়ে সামনে আসে। প্রিয় মানুষদের কেউ জীবন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে আমরা ভাবতে বসি যে, আগেই সচকিত হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু তখন আর সময় থাকে না।

মনের ঠিকঠাক যত্ন না নেওয়ার কারণে আমাদের মধ্যে হতাশা-বিষণ্ণতার মতো বিষয়গুলো চরম আকার ধারণ করে। এ পরিস্থিতিতে মানুষের মনে অনেকগুলো সমীকরণ কাজ করে। সেখান থেকে কিছু সমীকরণ থেকে বের হতে না পেরে মানুষ আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নেয়। 

গত ৬ মে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘রাজধানীতে পৃথক স্থানে তিন শিক্ষার্থীসহ ৪ জনের ‘আত্মহত্যা’। সংবাদ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডা এলাকায় পৃথক স্থানে দুই কিশোরী, এক গৃহবধূ ও যুবকসহ চারজন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মৃতেরা হলেন–খিলগাঁওয়ের সামিয়া আক্তার (১৪) ও শিহাবুল ইসলাম (২৪), যাত্রাবাড়ী এলাকার প্রিয়ন্তী সরকার (১৪) ও বাড্ডা এলাকার মো. বিথি (২০)। তাঁদের মরদেহ ময়নতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

প্রতীকী ছবিপ্রায় প্রতিদিন এই ধরনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে আত্মহত্যা সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঁচল ফাউন্ডেশন প্রতি বছর এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ বছরের (জানুয়ারি) আঁচল ফাউন্ডেশনের আত্মহত্যাবিষয়ক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ৩১০ জন আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশই ছিল নারী।

নারীদের এই আত্মহত্যার পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মানসিক কারণ জড়িত, যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ বুঝতে পারে না। অথচ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের অসুস্থতার মতো মানসিক রোগও এক ধরনের অসুস্থতা। অন্য যেকোনো অসুস্থতার মতোই চিকিৎসার মাধ্যমে এ যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। তাই সার্বিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের অনেক বেশি সচেতনতার প্রয়োজন।

আত্মহত্যা প্রবণতা নারীদের মধ্যে এক ভয়ানক সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন শান্তিবাড়ীর সাইকোলজিস্ট রাজিয়া সুলতানা রীমা। তিনি জানান, দেশে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে বেশির ভাগ নারী। এই উচ্চহারের পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। যেমন–মানসিক চাপ, পারিবারিক সহিংসতা, বৈষম্য, যৌন নিপীড়ন, সামাজিক নিগ্রহ, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট। অনেক নারী দিনের পর দিন সহিংসতার শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, অথচ সমাজ ও পরিবার থেকে তারা তেমন সহায়তা পান না। বৈবাহিক জীবনের চাপে, প্রেমে বিশ্বাসভঙ্গ বা কর্মক্ষেত্রে হয়রানির মতো ঘটনা নারীদের হতাশায় ডুবিয়ে দেয়। নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পরামর্শদানের সুযোগের অভাবও এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে।

প্রতীকী ছবি: পেক্সেল ডটকমমহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক প্রতিবেদন (এপ্রিল) থেকে জানা যায়, এপ্রিল মাসে মোট ১৬৯ জন কন্যা এবং ১৬৩ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জন কন্যাসহ ২৪ জন আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে আত্মহত্যার প্ররোচনার শিকার হয়েছে ১ কন্যাসহ ২ জন। গত ৪ এপ্রিল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় মহিলা পরিষদ। 

এ তো গেল গত মাসের নারী সম্পর্কিত আত্মহত্যার পরিসংখ্যান। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত চার মাসের ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদন’ থেকে জানা যায়, জানুয়ারি মাসে ১ শিশু, ২২  কিশোরী ও ২৩ নারীসহ মোট ৪৬ জন আত্মহত্যা করেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে ২ শিশু, ১২ কিশোরী ও ৩৪ নারীসহ মোট ৪৮ জন; মার্চে ১৭ কিশোরী ও ২৪ নারীসহ মোট ৪১ জন এবং এপ্রিলে ১২ কিশোরী ও ২৩ নারীসহ মোট ৩৫ জন আত্মহত্যা করেছে। এর মানে গত চার মাসে মোট ১৭০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। 

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী তান্ইয়া নাহার ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচলিত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টাও একটি অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ধারামতে, যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তাহলে সে ব্যক্তি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে–যার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এ ছাড়া কেউ যদি আত্মহত্যায় সহায়তা বা প্ররোচনা দেয় তাহলে একই আইনের ৩০৬ ধারা অনুযায়ী সে ব্যক্তি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে, যার মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং এ ছাড়া অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে। আবার এই দণ্ডবিধিরই ৩০৫ ধারামতে, যদি আত্মহত্যাকারী আঠারো বছরের কম বয়স্ক কোনো ব্যক্তি, উন্মাদ ব্যক্তি, প্রলাপগ্রস্ত ব্যক্তি, নির্বোধ ব্যক্তি অথবা কোনো প্রমত্ততাগ্রস্ত ব্যক্তি হয়ে থাকে, তাহলে আত্মহত্যা সহায়তাকারী বা প্ররোচনাকারী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে, কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ বছর মেয়াদি কারাদণ্ডে এবং এতদ্ব্যতীত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।’

প্রতীকী ছবি: পেক্সেল ডটকমআইনজীবী তান্ইয়া নাহারের মতে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকার পেছনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অসাম্য, অসংবেদনশীলতা, শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা, অত্যাচার, অবহেলা, অবিচার, যৌতুক, ধর্ষণ, ইভ টিজিং ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা যায় সহজেই। আর এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রয়োজন প্রকৃত নারীবান্ধব এবং নারীর প্রতি সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। 

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হারও উচ্চ। আঁচল ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে মানসিক চাপ, একাকিত্ব, একাডেমিক চাপ এবং সামাজিক প্রত্যাশার বোঝা অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, নারী শিক্ষার্থীরা এই চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে গিয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর হার ৬৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। 

প্রতীকী ছবিসাইকোলজিস্ট রাজিয়া সুলতানার মতে, আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে হলে প্রথমে নারীদের জন্য নিরাপদ, সহানুভূতিশীল এবং সহায়ক সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। নিয়মিত কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন সার্ভিস এবং কমিউনিটিভিত্তিক সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে নারীরা তাদের মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশের সুযোগ পাবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নারীস্বাস্থ্য ও মানসিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তাদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সমবেত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই আত্মহত্যা প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।