চা,পান আর মুদির দোকানের নারীদের স্বপ্ন

নারী বলতেই আমরা বুঝি, সকালে ঘুম থেকে ওঠে পরিবারের কাজ শুরু করা এবং সন্তানের দেখাশোনাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ করা। এ যেন তার নিত্যদিনের বাঁধাধরা রুটিন।

নারীরা জীবিকার তাগিদে পরিবারের দায়িত্বও নেন। এ কাজে পরিবার কিংবা প্রিয়জনের সহযোগিতাও পান। তবে, এমন অনেক নারী আছেন, যারা পরিবার থেকে কোনো সহযোগিতা পান না। তবুও থেমে থাকে না তাদের জীবন সংগ্রামের লড়াই। তারা নিজের পাশাপাশি সন্তানের পড়ালেখারও দায়িত্ব নেন। এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনেন।

সমাজে অনেক নারীই বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকেন। তারা সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও নিম্নশ্রেণির নারীরা নিজ নিজ পেশায় মানবেতর জীবন কাটান।

চা বিক্রেতা হালিমা খাতুন। ছবি: সংগৃহীতসমাজে অনেক নারী আছেন, যারা মুদি, চা, সবজির দোকানে ব্যবসা করেন। এমন একজন নারী চা বিক্রেতা হালিমা খাতুনের সঙ্গে দেখা হয় বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে। কীসের জন্য তিনি এই পেশায় আছেন, এই প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ২ ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়া দিছি। এহন ছোট পোলারে বড় করাই আমার স্বপ্ন। ছেলেমেয়ের জন্যই এই যে চা বিক্রি করতেছি ৮ বছর ধইরা। আমার জামাইয়ের ইনকামে সংসার চালানো অনেক কষ্টের হয়। ভাবলাম আমিও ইনকাম করলে বাচ্চাগুলোকে ভালো কইরা মানুষ করতে পারমু। ওগো ভবিষ্যৎ করে দিতে পারলে আমার শান্তি। আমি সকাল ১০ টা থেইকা চা বিক্রি করি। আর সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকি।’

সন্ধ্যার পর চা বিক্রি করেন না কেন? হালিমা এর জবাবে জানান, সন্ধ্যার পরে চা বিক্রি করাটা অনেকেই ভালো ভাবে নিতে চান না। আমি চাই না কারো কাছে খারাপ হইতে। আমাগো সমাজ তো ভালা কিছু ভাবতেই পায় না। এমনিতেই দিনে ব্যবসা করি তাই কত মাইনষে কত কিছু কয়। আমি চা বিক্রি করি আমার প্রয়োজনে। কেউ কি আর আমার সন্তানদের দেখব? নাকি আমি কারো কাছে হাত পাতলে আমারে সাহায্য করবো।

পান বিক্রেতা রানু বেগম। ছবি: সংগৃহীতমিরপুরে বাংলা কলেজের পাশেই দেখা হয় পান বিক্রেতা রানু বেগম এর সঙ্গে। তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘১২ বছরের বেশি হইয়া গেল পান বিক্রি করতাছি। শ্যামবাজার থেইকা পাইকারি দামে পান কিন্না আনি। সকাল ১০ টা থেইকা রাত ১২ টা পর্যন্ত বিক্রি করি পান। সিজন অনুযায়ী পান বিক্রি করি। ঈদ, পূজা আর বিয়ার সিজনে পান বেশি বিক্রি হয়। পান বিক্রি কইরা যা লাভ হয় খারাপ না। নিজেরে চালাইতে পারি এইটাই অনেক। কারো দুয়ারে তো আর হাত পাতি না। বয়স হইতাছে একটু কষ্ট হয় কী।’

সমাজে একেক নারীর জীবন একেক রকম। একজন জীবন চালানোর জন্য কষ্ট হওয়া সত্যেও পান বিক্রি করেন আরেকজন নিজের সন্তানদের জন্য চা বিক্রি করেন। দুজনেই কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নীরবে যুদ্ধ করছেন।

মুদি দোকানদার হালিমা আক্তার হ্যাপি। ছবি: সংগৃহীতনারিন্দার বেগমগঞ্জের মুদি দোকানদার হালিমা আক্তার হ্যাপি। মুদির দোকানে বসেন।  নিজের স্বপ্ন নিয়ে বলেন, ‘মুদি দোকান করতেছি ১৫ বছর ধইরা। সবাই যেমন স্বপ্ন দেখে, আমিও স্বপ্ন দেখি। দোকান আরো বড় করমু, আর একটা দোকান দিমু। এই দোকান কইরা মেয়েরে বিয়া দিলাম। ছেলেরে এহন ও পরাইতাছি। এহন তো ভাড়ায় দোকান চালাই, আমার ইচ্ছা নিজের দোকান হইবো। সকাল ৮ টায় দোকান খুলি আর রাত ১ টা বা ২ টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। বাসা কাছেই তাই সমস্যা হয় না। জামাই এ কাজে সহযোগিতা করে। সংসারের কাজ কইরা তারপরে দোকানে বসি।’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে চা,পান বিক্রি কিংবা মুদির দোকান করা সহজ নয়। হালিমা, রানু, হ্যাপিদের মতো অনেক নারীই জীবনের প্রয়োজনে বেঁছে নিয়েছেন সংগ্রামী জীবন। প্রত্যেকেই তাদের এই পেশা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখেন তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে। তাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন পূরণ হোক এবং জীবনের চলার পথ সহজতর হোক।