যৌতুকের মামলার আগে ভুক্তভোগী নারীর মধ্যস্থতায় যাওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত?

যৌতুক একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্যতম রূপ। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে যৌতুক দাবি ও যৌতুকজনিত নির্যাতন অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত এবং এর জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান। গত ১ জুলাই ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এর মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ সংযোজিত নতুন বিধানে যৌতুক দাবি বা যৌতুকজনিত সাধারণ জখমের শিকার নারীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা প্রবর্তন করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে যৌতুক দাবি, যৌতুকের কারণে সাধারণ জখমের শিকার নারীদের বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বিধানে যুক্ত করা মানে ভুক্তভোগীকে আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।

প্রথমত, এই বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা ভুক্তভোগী নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অপরাধ সংঘটনের পর মামলা দায়েরের মাধ্যমে অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। যখন নারীকে বাধ্যতামূলকভাবে মামলার পূর্বে মধ্যস্থতায় অংশ নিতে বলা হয়, তখন তাকে নিজের আইনি অধিকার প্রয়োগ না করে আপসের পথে যেতে চাপ দেওয়া হয়। এতে করে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই তা বাধাগ্রস্ত হয়।

দ্বিতীয়ত, যৌতুক একটি সামাজিক ও কাঠামোগত সহিংসতা, যা বহু ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্ত হয়। মধ্যস্থতা যদি ব্যর্থ হয়, তবে সেই প্রক্রিয়ায় যেসব তথ্য বা বক্তব্য উঠে আসে, তা পরবর্তীতে মামলায় ব্যবহার করতে পারা না পারার প্রশ্নে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি অনেক সময় মধ্যস্থতার নামে ভুক্তভোগীকে হুমকি, চাপ কিংবা প্রলোভনের মাধ্যমে মামলা না করার দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।

ব্যারিস্টার-ইফফাত-গিয়াস-আরেফিন। ছবি: সংগৃহীততৃতীয়ত, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধমূলক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা নয় বরং বিচারের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মধ্যস্থতা সাধারণত দেওয়ানি বা পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে, যেখানে অপরাধের উপাদান নেই। কিন্তু যৌতুক দাবি ও নির্যাতনের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে মধ্যস্থতার সুযোগ দেওয়া হলে, তা অপরাধকে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে এবং অপরাধীর দায়মুক্তি ঘটায়।

চতুর্থত, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যথার্থভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে একটি কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এতে করে অপরাধী পক্ষে সুবিধাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং ভুক্তভোগীর হয়রানি ও মানসিক চাপ বাড়বে। উপরন্তু, সমাজে ভুল বার্তা যায় যে, যৌতুক দাবির মতো অপরাধেও আপস সম্ভব।

এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, যৌতুকের মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা নারী অধিকার, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্রের উচিত হবে এমন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যা নারীকে শক্তিশালী করে এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করে। মধ্যস্থতার মতো বিকল্প পদ্ধতির সুযোগ থাকলেও তা হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, ভুক্তভোগীর স্বাধীন ইচ্ছায় এবং সম্পূর্ণ আইনি সহায়তা ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার মাধ্যমে। বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা অপরাধের বিচারের পথকে ধীর ও দুরূহ করে তুলবে।

যৌতুকের মতো অপরাধে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা ন্যায়সঙ্গত নয়। এটি ভুক্তভোগী নারীর বিচার প্রাপ্তির পথে অন্তরায় এবং রাষ্ট্রীয় দায় এড়িয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম। এ ধরনের বিধান পুনর্বিবেচনা করে তা বাতিল করা এবং যৌতুক নির্মূলের জন্য কার্যকর ও সংবেদনশীল আইন ও নীতিমালা প্রণয়নই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট