জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হলো গতকাল ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই গণঅভ্যুত্থান গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে গত এক বছরে দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে বহু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও ভাষ্য এসেছে। তবে, বাংলাদেশের মাটিতে যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, সে স্বপ্ন কতটুকু আশার আলো দেখেছে, তা এ দেশের মানুষই ভালো বলতে পারবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর। ১ বছর মানে ৩৬৫ দিন। মানুষের মনে বছরের প্রতিটি দিন নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে। এর কিছু থাকে ব্যক্তিক, কিছু সামষ্টিক। কিন্তু কিছু ঘটনা আবার এমন থাকে, যা ব্যক্তি তো বটেই সামষ্টিক স্বপ্নকেও ধূলিস্যাৎ করে দেয়।
বলছি ধর্ষণের কথা। এ দেশের মাটিতে শিশু থেকে বৃদ্ধা, অন্তঃসত্ত্বা নারী–কেউই এই বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ধর্ষণের ঘটনা ভুক্তভোগী কন্যাশিশু বা নারীকে তিল তিল করে মেরে ফেলে। অনেক সময় ভুক্তভোগী নারী অসহায় হয়ে আত্মহত্যারও সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে কিছু ঘটনা বর্বরতা বিবেচনায় সবকিছুর মাত্রা ছাড়িয়ে সবাইকে হতবিহ্বল করে দেয়।
মহিলা পরিষদের এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম ৭ মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৬০ শতাংশ।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদন’ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৪২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৭টি, মার্চে ১৩২টি, এপ্রিলে ৯৩টি, মে মাসে ৫৯টি, জুনে ৬৩টি, জুলাইয়ে ৫৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, গত ৭ মাসে দেশে মোট ৫০২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একই সংগঠনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনমতে, ওই বছরের প্রথম ৭ মাসে মোট ৩৯০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
অর্থাৎ, এমএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ধর্ষণ বেড়েছে ২৯ শতাংশ।
এবার আসি ২০২৫ সালে। ২০২৫ সালের ধর্ষণের অনেক ঘটনায় দেশ তোলপাড় হয়। রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এই ঝড় সামাল দিতে গিয়ে আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন উপদেষ্টা বিচার প্রক্রিয়াকে ফাস্ট ট্র্যাক করার কথাও বলেছেন। প্রশ্ন হলো–কোন কোন ক্ষেত্রে? উত্তর হলো– নিশ্চিতভাবেই ধর্ষণের কোনো ঘটনা আলোচিত হলে। অর্থাৎ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা সামনে না এলে প্রশাসন আগের মতোই তেমন একটা নড়েচড়ে বসেনি। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা মাটিতে চাপা পড়ে গেছে, নতুবা ছাই হয়ে বাতাসের উড়ে গেছে।
ধর্ষণের এসব ঘটনা ঘটেছে ট্রেনে, ঘরের ভেতরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, এটিএম বুথে, রাইড শেয়ারে, বাসে, স্কুলে যাওয়ার পথে, মেট্রো স্টেশনের নিচে। তাহলে নারীরা আজ কোথায় নিরাপদ? এমনকি দরজা বন্ধ ঘরের ভেতরে থাকার পরও ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না কেউ কেউ। ৫ মার্চ রাতে ধর্ষণের শিকার মাগুরার সেই শিশুটি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই শিশুর একদিনে চারবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও হয়েছিল।
শুধু কি মাগুরা? না। সারা দেশে ঘটে চলছে ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে ভুক্তভোগী পরিবারের দুঃখ, কষ্ট, অপমান।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘গত এক বছরে দেশে নারীর অবস্থান অনেকটা পিছিয়ে গেছে। নারীদের চলাফেরা, পোশাক নিয়ে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে। নারীরা এ সময়কালে বহু জায়গায় মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। এ কথা সত্য যে, গত এক বছর ধরে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যকে লালন করা হচ্ছে। এ কারণে নারী নির্যাতন বাড়ছে, সমাজে ধর্ষণের ঘটনারও বাড়ছে। এর কারণ হলো এ সময়কালে নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতি সামনে এসেছে। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এ কারণেও ধর্ষণের মতো অপরাধ বাড়ছে।’
ডা. ফওজিয়া মোসলেমের মতে, নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদে নারী আসন নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঐক্যমত্য কমিশনে নারী নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি ছাড়া নারী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নারীকে তো এজেন্ডার মধ্যে রাখা হচ্ছে না। তাই নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, নারীর সমতায় বিশ্বাসী হতে হবে। প্রশাসনকে নারীবান্ধব হতে হবে। সমাজে নারীর অবস্থান শক্তিশালী হলে ধর্ষণের মতো ঘটনাও কমবে।
ধর্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে জানান, সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলনের কারণে নারী ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী, ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি ৭ বছর থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে (ধারা ৩৭৫ ও ৩৭৬)। শিশু ধর্ষণ হলে, দণ্ডবিধি ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী, অবশ্যই কঠিন শাস্তি প্রযোজ্য হবে–সেক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। কিন্তু এরপরও ধর্ষণ কমছে না।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে কী ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে তা নিয়ে জানতে চাইলে সাইকোলজিস্ট রাজিয়া সুলতানা রীমা বলেন, ‘একজন ধর্ষকের মানসিক গঠন তার শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নীতির ঘাটতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। ছোটবেলায় সহিংস পরিবেশে বেড়ে ওঠা, অবহেলা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তাহীনতা এবং নৈতিকতার অভাবে একজন ব্যক্তির মনের ভেতর আক্রমণাত্মক ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রবণতা গড়ে ওঠে। শৈশবে প্রাপ্ত সহিংস অভিজ্ঞতা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার ও যৌন সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।’
রাজিয়া সুলতানার মতে, ‘এটি শুধু শাস্তি দিয়ে থামানো সম্ভব নয়। বরং শৈশব থেকে ইতিবাচক মানসিক চর্চা শেখানো জরুরি। সমাজকে যৌনতা ও সম্পর্ক নিয়ে সুস্থ আলোচনা, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং ভুক্তভোগীর প্রতি সহমর্মিতা শেখাতে হবে। রাষ্ট্রকে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং ধর্ষণকারীর জন্য বাধ্যতামূলক মানসিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করলে অপরাধীর মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে এবং সমাজে প্রতিরোধমূলক ভয় কাজ করবে। এ জন্য প্রয়োজন সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক চর্চার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে গড়ে তুলতে পারে।’