নারী আন্দোলনের গতি প্রকৃতি সব সময় একরকম থাকেনা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক থেকে বহুমুখী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারী আন্দোলন সামাজিক আন্দোলন হয়ে উঠলেও নারীর জীবনে মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। আন্দোলন সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণ থাকছে, কিন্তু নারীর অংশীদারিত্ব নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই। নারীর শিক্ষা, আত্মনির্ভরশীলতার কথা, পিতৃতান্ত্রিকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে রোকেয়া কথা বলেছেন, সেই জায়গাগুলো এখনো পরিবর্তিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে রোকেয়াকে সমাজের মূল ধারার নারী আন্দোলনের অংশ করে তুলতে সমাবেশ আয়োজন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যাম্পেইন পরিচালনা, পায়রাবন্দে কর্মসূচি আয়োজন করা প্রয়োজন।
রোকেয়া দিবস পালন উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের সংগঠকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম এসব কথা বলেন। গত ১৪ আগস্ট মহিলা পরিষদের উদ্যোগে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনের প্রকাশনা সম্পাদক সারাবান তহুরা, সংগঠনের পক্ষে বক্তব্য রাখেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম।
স্বাগত বক্তব্যে মালেকা বানু জানান, বর্তমানে রোকেয়া ও তাঁর দর্শন নানামুখী আক্রমণের শিকার। সমাজনির্মিত অবরোধ প্রথাকে ভেঙে নারীরা কীভাবে নিজেদের জায়গা তৈরি করবেন, স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, তাঁর চিন্তা তিনি নারীদের মধ্যে প্রবাহিত করেছিলেন আজ থেকে প্রায় দুইশো বছর আগে। পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, বৈষম্যমূলক প্রথাকে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে নারীর অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। নারী মুক্তির বিষয়ে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এই সময়ে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল হলেও, পুরুষতান্ত্রিকতার আধিপত্যবাদ নারীকে পিছিয়ে দিচ্ছে। নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রেক্ষিতে রোকেয়ার দূরদর্শিতা, সাহস এবং সাংগঠনিক চিন্তা ভাবনাকে ধারণ করে তরুণ প্রজন্মকে সাথে নিয়ে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নারী আন্দোলন কীভাবে অগ্রসর হবে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য আজকের সভার আয়োজন করা হয়েছে।’
ধারণাপত্রে সারাবান তহুরা জানান, বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন শিক্ষা ও সামাজিক মুক্তির আন্দোলনে নারীদের সংগঠিত করার মাধ্যমে সচেতন করেছেন। রক্ষণশীল সমাজে জন্ম নিয়েও স্বশিক্ষিত হয়ে তিনি অন্তঃপুরবাসিনী নারীদের সমান অধিকার আদায় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর ইংরেজিতে লেখা সুলতানা’স ড্রিম সম্প্রতি ইউনেসকো কর্তৃক Memory of the World স্বীকৃতি পেয়ে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করেছে। আজ নারীরা নানা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করলেও বাল্যবিবাহ, সম্পত্তিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, পাশাপাশি সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য ও নারী বিদ্বেষী মানসিকতা বিদ্যমান আছে। নারী প্রগতিবিরোধী এই শক্তিকে মোকাবিলা করে নারী মুক্তির লক্ষ্যে রোকেয়ার করা সংগ্রামকে নিয়মিত চর্চা করতে হবে, তাঁর আদর্শিক চেতনাকে দৃশ্যমান রাখতে হবে এবং রোকেয়া দিবসকে শুধু ডিসেম্বর মাসে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো বিস্তৃত পরিসরে দৃশ্যমান করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় অগ্নি ফাউন্ডেশন, নি:সংকোচ ফাউন্ডেশন, কর্মজীবী নারী, বহ্নিশিখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ, রামরু, ই্য়ুথ নেট গ্লোবাল, জাগো নারী, লাল-সবুজ সোসাইটি, সাংগাত, প্রাগ্রস্বর, বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংসদ, পল্লীমা মহিলা পরিষদ থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ, আরণ্যক নাট্য দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের প্রোগ্রাম অফিসার তাসনিম সায়মা।