সৌন্দর্য ও সংস্কারের প্রতীক, ইরানের শেষ সম্রাজ্ঞী ফারাহ

এক সময়ের ঝলমলে রাজপ্রাসাদ, রাজকীয় আভিজাত্য আর আধুনিক ইরানের স্বপ্ন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। ফারাহ পাহলভি, ইরানের শেষ সম্রাজ্ঞী এবং আধুনিক মুসলিম বিশ্বে প্রথম মুকুটধারী নারী। সৌন্দর্য, রুচিশীলতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রতীকী চরিত্র।

প্রায় ৬৭ বছর আগে ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি বিয়ে করেন ফারাহ দিবাকে। এর আগে শাহ দুবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। প্রথম স্ত্রী প্রিন্সেস ফাওজিয়া’র সঙ্গে নয় বছরের দাম্পত্যের পর বিচ্ছেদ হয়। দ্বিতীয় স্ত্রী সোরায়া এসফান্দিয়ারি বাখতিয়ারি’র সঙ্গে সংসারও টেকেনি। কারণ তাঁদের কোনো সন্তান হয়নি।

প্যারিস থেকে তেহরানের রাজপ্রাসাদ

ফারাহর বয়স তখন ২১। প্যারিসে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা করছিলেন। ৩৯ বছর বয়সী শাহর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এক দূতাবাস সংবর্ধনায়, যার আয়োজন করেছিলেন শাহর প্রথম পক্ষের কন্যা প্রিন্সেস শাহনাজ। প্রথম দেখাতেই তাঁদের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হয়। ১৯৫৯ সালের ১ ডিসেম্বর তাঁদের বাগদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। মাত্র তিন সপ্তাহ পর রাজকীয় আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বিয়ে।

১৯৩৮ সালের ১৪ অক্টোবর জন্ম নেওয়া ফারাহ ছিলেন সোহরাব দিবা ও ফরিদেহ দিবা ঘোটবির একমাত্র সন্তান। বাবার মৃত্যুর পর তিনি ইতালিয়ান স্কুল ও জঁ দার্ক স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে তেহরানের লিসে রাজিতে ব্যাকালোরিয়েট সম্পন্ন করেন।

বিয়ের জৌলুস ও ফ্যাশন আইকন

শাহর তৃতীয় বিয়ে হওয়ায় এই আয়োজন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ইসলামি নিকাহ অনুষ্ঠানের পর হয় জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা। ফারাহর বিয়ের পোশাক সেদিন বিশ্বমাধ্যমের দৃষ্টি কাড়ে। তিনি পরেছিলেন হ্যারি উইনস্টনের তৈরি টিয়ারা, যাতে বসানো ছিল ৬০ ক্যারেটের ‘নূর-উল-আইন’ গোলাপি হীরা। তাঁর গাউনটি ছিল ইভ সাঁ লরাঁ’র নকশায় তৈরি। পরবর্তীকালে তাঁর পরিমিত অথচ আধুনিক ফ্যাশনবোধ তাঁকে ‘প্রাচ্যের জ্যাকি কেনেডি’ উপাধি এনে দেয়।

উত্তরাধিকার ও জনকল্যাণে ভূমিকা

শাহর তৃতীয় স্ত্রী হওয়ায় এবং পুরুষ উত্তরাধিকারীর অভাব থাকায় তাঁর ওপর ছিল বাড়তি চাপ। ১৯৬০ সালে জন্ম নেন ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি। এরপর জন্ম নেন প্রিন্সেস ফারাহনাজ (১৯৬৩), প্রিন্স আলিরেজা (১৯৬৬) ও প্রিন্সেস লায়লা (১৯৭০)।

রাজপরিবারের সদস্য হয়েও ফারাহ জনজীবনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি শিশু ও নারীদের কল্যাণ, প্রতিবন্ধীদের সহায়তা এবং সামাজিক সংস্কারে ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগে ইরানে শুরু হয় একাধিক সাংস্কৃতিক আয়োজন শিরাজ ফেস্টিভ্যাল অফ আর্টস, তেহরান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সহ নানা উৎসব।

কুষ্ঠরোগীদের সহায়তায় তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকে তিনি কুষ্ঠকলোনি পরিদর্শন করেন এবং তাঁদের জন্য শিক্ষা ও কাজের সুযোগসহ আদর্শ আবাস গড়ে তুলতে ভূমি বরাদ্দে শাহকে রাজি করান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়।

প্রথম ‘শাহবানু’ ও নির্বাসনের জীবন

১৯৬৭ সালের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে ফারাহ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শাহবানু’ বা সম্রাজ্ঞী হিসেবে মুকুট পরেন, আধুনিক ইরানে এই প্রথম। শাহ ঘোষণা দেন, তাঁর অনুপস্থিতি বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্রাউন প্রিন্স প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত ফারাহ রিজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রে যা ছিল বিরল সিদ্ধান্ত।

কিন্তু সময় বদলাতে থাকে। স্বৈরশাসন, রাজনৈতিক বিরোধ দমন, তেলসম্পদের অসম বণ্টন এবং গোপন পুলিশ সাভাকের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সত্তরের দশকের শেষ দিকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি, যিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ডাক দেন।

১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি শাহ ও সম্রাজ্ঞী ইরান ত্যাগ করেন। পরে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। শাহ আর কখনও ক্ষমতায় ফেরেননি। ফারাহ পাহলভিও রয়ে যান দীর্ঘ নির্বাসনে।

একদা আধুনিক ইরানের প্রতীক হয়ে ওঠা এই সম্রাজ্ঞীর জীবন আজ ইতিহাসের অংশ। যেখানে রাজকীয় আভিজাত্য, সংস্কার, বিতর্ক ও নির্বাসনের বেদনামিশ্রিত অধ্যায় একসূত্রে গাঁথা।