প্রতি ১০ জন শ্রমিকের প্রায় ৪ জনই নারী। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাদের অবদান বাড়ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়লেও মজুরি, পদোন্নতি ও মর্যাদার ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কার্যকর মজুরি মানদণ্ড ও তদারকির অভাবে এই বৈষম্য কমছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা সাত কোটির বেশি। এর মধ্যে দুই কোটি ৩৬ লাখ নারী, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবাখাত সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। গ্রাম থেকে শহর, ক্ষেতখামার থেকে কারখানা, সবখানেই তাঁদের উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান।
তবে শ্রমবাজারে পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করলেও মজুরির ক্ষেত্রে সমতা আসেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, একই ধরনের কাজ ও সমপরিমাণ শ্রম দেওয়ার পরও নারী শ্রমিকেরা দৈনিক গড়ে ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কম মজুরি পান।
শুধু মজুরিতেই নয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করেও অনেক নারী কর্মী কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পান না। অন্যদিকে পুরুষ সহকর্মীরা তুলনামূলক দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ পান।
বেকারত্বের চিত্রও নারীদের জন্য উদ্বেগজনক। উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ১১ শতাংশের কিছু বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রের বাইরে নারীরা প্রতিদিন যে বিপুল সময় গৃহস্থালি কাজ ও পরিবারের সদস্যদের যত্নে ব্যয় করেন, তার কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় না। ফলে তাঁদের প্রকৃত অবদান জাতীয় অর্থনীতির হিসাবে প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশে নির্দিষ্ট মজুরি মানদণ্ড না থাকায় নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সামাজিক ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিও নারীদের অগ্রগতির পথে বড় বাধা। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, নারী শ্রমিকদের আয় ও সুযোগের বৈষম্য কমাতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, সামাজিক সচেতনতা এবং বিদ্যমান শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। তা না হলে শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও সমঅধিকার ও ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা কঠিন হবে।