গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর জীবনকাহিনি শুধু একজন গণিতবিদের গল্প নয়। বরং স্টেম অর্থাৎ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে নারীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
ইতিহাস গড়া এক অর্জন
গণিতের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারগুলোর একটি ফিল্ডস মেডেল। ১৯৩৬ সালে চালুর পর প্রায় ৮০ বছর ধরে এই পুরস্কার পেয়েছেন শুধু পুরুষরাই। সেই ধারায় পরিবর্তন আনেন মরিয়ম মির্জাখানি। ২০১৪ সালে তিনি হন এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম নারী।
রিম্যান সারফেস ও জ্যামিতির জটিল গবেষণায় অবদানের জন্য তাঁকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে কঠিন মনে হলেও তাঁর এই অর্জন বিশ্বজুড়ে বড় প্রভাব ফেলেছিল।
নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়া
১৯৭৭ সালে ইরানের তেহরানে জন্ম মির্জাখানির। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। পড়াশোনা করেন শারিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিসে। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যান হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে, সেখান থেকেই পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
গণিত তাঁর কাছে শুধু পড়াশোনার বিষয় ছিল না, ছিল এক ধরনের শিল্প। জটিল সমীকরণ দিয়ে তিনি যেন ছবি আঁকতেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল জ্যামিতির জটিল শাখা, যা মহাবিশ্বের গঠন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৮ সালে এক ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাও তাঁকে থামাতে পারেনি। নিজের কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল অবিচল।
স্বীকৃতি ও ব্যক্তিজীবন
ফিল্ডস মেডেল ছাড়াও তিনি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৮ সালে তিনি বিয়ে করেন জান ভনড্রাককে, যিনি একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
২০১৩ সালে তাঁর স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালে, মাত্র ৪০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তবে অল্প সময়ের জীবনেও তিনি এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।
ধ্যানধারণা ভাঙার গল্প
মির্জাখানির গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, এটি প্রচলিত ধারণা ভাঙার গল্পও। অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সম্পর্কে নারীদের অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
ইরানে বিজ্ঞান ও গবেষণায় বড় বিনিয়োগ করা হয়। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই নারী। এই তথ্যই দেখায়, সুযোগ পেলে নারীরাও সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারেন।



