বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। সংসারের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যতে সময় দিচ্ছেন। এতে নারীরা চলার পথে বাধা-বিপত্তি যে পাচ্ছেন না, তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে উদ্যোক্তা হতে গেলে বাধাও সমানতালে আসতে থাকে। আশার বিষয় হচ্ছে শত বাধা–বিপত্তি পেরিয়ে দেশজুড়ে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে।
আজ ৯ আগস্ট ইন্টারন্যাশনাল ডে অব দ্য ওয়ার্ল্ডস ইন্ডিজেনাস পিপলস। সমতলের তুলনায় পাহাড়ের নারীদের লড়াইয়ের চিত্র ভিন্ন। সেই লড়াইয়ের জায়গা থেকে জেনে নেওয়া যাক দুই স্বপ্নজয়ী নারী উদ্যোক্তার কথা।
পাহাড় ঘেরা রাঙামাটি শহরে জন্ম ঋতিষা চাকমা জেন্সির। বাবা জনদেব চাকমা, আর মা নমিতা খীসা। ঋতিষার শৈশব কেটেছে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে। ছোটবেলা থেকে গয়নার প্রতি আগ্রহ ছিল ঋতিষার। সময় পেলে গয়না নিয়ে কাজ করতেন তিনি। একপর্যায়ে গয়না নিয়ে কাজ করাটা নেশা থেকে পেশায় চলে যায়।
সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। তখন ঋতিষা মাস্টার্সের শিক্ষাথী। সেই সময় তিনি নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত করে তুলতে চান। তাই চাকরি না করে মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে ‘বক্স অব অর্নামেন্টস’ এ কাজ শুরু করেন। ‘বক্স অব অর্নামেন্টস’-এর উল্লেখযোগ্য গয়না হলো আলছড়া, হুজি হারু (পেচানো চুড়ি), বাজু, চন্দ্রহার, নকশার হাঁসুলি ও রেয়ন সিল্কের গয়না। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋতিষা পাহাড় থেকে সমতলের মানুষদের কাছে নিজের তৈরি গয়না পৌঁছে দেন।
ঋতিষা পাহাড়ের ঐতিহ্যকে সমতলে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কাজটা খুব একটা সহজ নয়। পাহাড়ের একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন তিনি। তবে ঋতিষা মনে করেন, চলার পথে যতই বাধা -বিপত্তি আসুক না কেন, নিজের অবস্থান-স্বপ্ন থেকে সরে আসা উচিত নয়।
ঋতিষার স্বপ্ন, ‘বিশ্বের দরবারে আমাদের গয়নার গল্প, গয়নার ঐতিহ্য ও মোটিভগুলো তুলে ধরতে চাই। অর্থনৈতিকভাবে অনেক মানুষকে সাবলম্বী করে তুলতে চাই।’
নারী উদ্যোক্তা উপমা নেলী চাকমার জন্ম রাঙামাটিতে। বাবা আশা পূর্ণ চাকমা, আর মা মিতালী চাকমা। ব্যাংকার বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান উপমা। পাহাড় ঘেরা রাঙামাটি শহরেই উপমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও সেখানে ভর্তি না হয়ে রাঙামাটি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন।
উপমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছে ছিল এমন কিছু করার, যেখানে নিজের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় হবে। ২০০১ সালের একটি ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সে বছর অন্যতম ফ্যাশন ডিজাইনার তেনজিং চাকমার সঙ্গে মডেল হিসেবে কাজ করেন উপমা। এরপর থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। ২০০৬ সালে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয় তাঁর চাকরি জীবন। এর দুই বছর পর শিক্ষকতা ছেড়ে কাজ শুরু করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়।
এরপর ২০১০ সালে ঢাকায় আসেন উপমা। ঢাকা শহরের একঘেয়েমি জীবন যখন তাঁর ভালো লাগছিল না, তখন নিজের জন্য কিছু করার ভাবনা মাথায় আসে। শুরু থেকেই ক্লোদিং সেক্টরে কাজ করার ইচ্ছে ছিল তাঁর। ঠিক করেন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করবেন। এই ভাবনা থেকে ২০১২ সালে বোনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেন নতুন উদ্যোগ।
উপমা ডিগ্রীধারী ডিজাইনার নন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পাঁচ জন কাজ করেন। ২০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘রানজুনি’র মাসিক আয় দুই লাখের বেশি। ‘রানজুনি’র পণ্য দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফিনল্যান্ড, জার্মানি ও আমেরিকাতেও পৌঁছে গেছে।