স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৫৫ সালের ২৮শে আগস্ট জোড়াসাকোঁর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর দশম সন্তান ছিলেন। তাঁর সাহিত্য প্রতিভা ছিল বিচিত্রমুখী। উপন্যাস, কবিতা, নাটক, গল্প-সাহিত্য সব ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিচরণ। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র।
ঠাকুর পরিবারের নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। রবীন্দ্রনাথের ভগিনী স্বর্ণকুমারী নিজের প্রতিভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন। উপন্যাস, কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, গীতিনাট্য ও প্রবন্ধ, সাংবাদিকতাসহ সব ক্ষেত্রেই তিনি স্বাক্ষর রেখে গেছেন। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট জানকীনাথ ঘোষালের সঙ্গে। তিন সন্তানের জন্মের পর ১৮ বছর বয়সে তিনি উপন্যাস রচনায় হাত দেন।
স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাসগুলিকে দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়—ঐতিহাসিক উপন্যাস ও সামাজিক উপন্যাস। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস রয়েছে তাঁর 'দীপনির্বাণ', 'ফুলের মালা', 'মিবার-রাজ' এবং 'বিদ্রোহ' প্রভৃতি উপন্যাস। আর সামাজিক উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে 'ছিন্ন মকুল', 'হুগলীর ইমামবাড়ি', ‘স্নেহলতা’ ও 'কাহাকে'।
লেখক থেকে সম্পাদকে উত্তীর্ণ হতেও বেশি সময় লাগেনি তাঁর। একসময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী দেবীকৃত ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনবার তাঁকে সম্পাদক হতে হয়েছিল। প্রথমবার এগার বছরের জন্য, এর পরেরবার আট বছরের জন্য এবং শেষেরবার দুই বছরের জন্য তিনি সম্পাদক হন। সব মিলে একুশ বছর তাঁর সম্পাদনায় সমৃদ্ধ হয়, ‘ভারতী’ পারিবারিক সাহিত্যপত্রিকা।
স্বর্ণকুমারী দেবীর উদ্যোগে ১৮৯৬ সালে লেখাপড়া না জানা কুমারী মেয়ে আর স্বামীহারা নারীদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সখি সমিতি’। এই সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাড়ির অন্তঃপুরের নারীদের লেখাপড়ার মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলা হত। এমনকি তাঁদের থাকা খাওয়ার সব দায়িত্ব নিত ‘সখি সমিতি’। পাশাপাশি অনাথ শিশুদেরও দায়িত্ব নিত এই সমিতি।
স্বর্ণকুমারী দেবী তিন শতাধিক গানের রচয়িতা। ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের মধ্যে গান রচনা ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর স্থান ছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণকুমারী দেবীকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৩২ সালের ৩ জুলাই তিনি মারা যান।