ইমরানের গ্রেপ্তারের পেছনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী?

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পার্টির প্রধান ইমরান খানকে গতকাল মঙ্গলবার ইসলামাবাদের আদালত চত্বর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাঞ্জাবের পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি, করেছে দেশটির আধা সামরিক বাহিনী পাকিস্তান রেঞ্জার্স। একটি দুর্নীতির মামলায় ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এখন সে দেশের দুর্নীতি দমন সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরোর (এনএবি) হেফাজতে আছেন।

ইমরানের গ্রেপ্তারের খবরে তাঁর দলের সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, যা খুবই স্বাভাবিক। নানা জায়গায় জ্বালাও-পোড়াওয়ের পাশাপাশি হামলা-ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। ইমরানের দল তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আজ বুধবার ইসলামাবাদে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। এবং এই বিক্ষোভ হবে ইসলামাবাদের আদালত চত্বরে।

পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু ইমরানের ক্ষেত্রে যে প্রতিক্রিয়া হলো তা অন্য সময় দেখা যায়নি। এর কারণটা কী?

রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ডন পত্রিকাকে বলেছেন, ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে এনএবি বারবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও ইমরান খান হাজিরা দেননি। এ জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার অবশ্য গত মার্চ মাস থেকে ইমরানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু পিটিআই-এর নেতা-কর্মীরা লাহোরে ইমরানের বাড়ির সামনে নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তোলায় সেটা সম্ভব হয়নি। ফলে বেছে নেওয়া হয়েছে তাঁর আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময়কে। শেষ পর্যন্ত অরক্ষিত আদালত থেকে তুলে নেওয়া হলো ইমরানকে। কিন্তু ইমরানের ঘনিষ্ঠ ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরীর অভিযোগ, তাঁকে শারীরিক অত্যাচার করার জন্যই হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

সেনাবাহিনীর দায়

দুর্নীতির অভিযোগে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে-এটা পিটিআই-এর নেতা-কর্মী কেন পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন না। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই গ্রেপ্তারের পেছনে সেনাবাহিনীর হাত রয়েছে। ডনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সেনা গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাঁকে হত্যার অভিযোগ আনেন ইমরান। গত নভেম্বরের ঘটনা এটি। তিনি তাঁর টুইটার হ্যান্ডেলে এর ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেন। একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ আসলে হজম করতে পারেনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

ইমরান নিজেও গ্রেপ্তারের অনুমান করেছিলেন। এ জন্য আদালতে যাওয়ার আগে তিনি একটি ভিডিও বার্তা রেকর্ড করেন। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার কথাগুলো যখন আপনাদের কাছে পৌঁছাবে, তখন হয়তো ভিত্তিহীন মামলায় আমি গ্রেপ্তার হয়েই থাকব। ’ ডনের সম্পাদকীয়তে আজ বুধবার লেখা হয়েছে, ঘটনা পরম্পরায় মনে হচ্ছে ইমরান খানের সাথে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন করে ঝামেলা- এটাই ধারণা দেয় তাঁকে একেবারেই অন্য কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ধারণা আরও পোক্ত করেছে পুলিশ নয় পাকিস্তান রেঞ্জার্স তাঁকে গ্রেপ্তার করায়।

ইমরান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর সমর্থকেরা রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদরদপ্তরের মূল ফটকের নিয়ম লংঘন করে ঢুকে পড়ে। লাহোর, সারগোদাসহ বিভিন্ন স্থানে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যার ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও সরকার ফেসবুক, টুইটারসহ সব সামাজিক মাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বলে ডন পত্রিকা জানিয়েছে। তবে এই হামলার সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে পেশোয়ারে। সেখানে চাঘাই স্মৃতি স্মারকে আগুন দিয়েছে জনতা। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালানোর সাফল্যের স্মারক হিসেবে এই চাঘাই মনুমেন্ট করা হয়েছিল। এর থেকেই ধারণা করা যায়, মানুষ ক্রোধ কোন পর্যায়ে।

ডনের সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে, গত ১৩ মাসের ঘটনাবলিকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অতীতের আলোকে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে একে, বিশেষ করে রাজনীতির জগতে নাক গলানো বলেই মনে হচ্ছে। সম্প্রতি এক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার দিকে আঙুল তোলার সময় ইমরান জানতেন, এটা সরাসরি সামরিক নেতৃত্বের দিকেই যাবে। গত এক বছরে সভা-সমাবেশ করে ইমরান প্রমাণ করেছেন, তাঁর পেছনে জনসমর্থন আছে। ফলে তাঁর কথার একটা ওজনও আছে। শাসকেরা একে একেবারে ফেলনা বলতে পারেন না।

আদালতের ভূমিকা কী ছিল

আদালত চত্বর থেকে ইমরানকে গ্রেপ্তারের পর প্রচণ্ড ক্ষেপে ছিলেন ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমের ফারুক। তিনি সাথে সাথে ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান, স্বরাষ্ট্রসচিব ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। সময় বেঁধে দেন ১৫ মিনিট। ডনের হিসাব অনুযায়ী, ৪৫ মিনিট পরে আদালতে আসেন তাঁরা। ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান তাঁকে জানান, ইমরান খানের গ্রেপ্তারের খবর তিনি সংবাদমাধ্যমে দেখেছেন।

এতে আরও ক্ষুব্ধ হন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, তাঁর জানামতে, ইমরানকে এনএবি গ্রেপ্তার করেনি। আর এ ক্ষেত্রে যদি আইনের লংঘন হয়ে থাকে, তাহলে যথাযথ আদেশ দেবেন।

প্রধান বিচারপতি ফারুক আরও বলেন, ‘এটা কী বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নয়। গ্রেপ্তার বে-আইনি নয়? সবকিছুই আপনাদের সামনে ঘটল। আইনজীবীরা আক্রান্ত হলেন। ... আমার আদালত আক্রান্ত হলো।’ তিনি বলেন, ‘দরজা-জানালা ভাঙার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ না। এই আদালত ভবনের মর্যাদা যে ক্ষতিগ্রস্ত হলো এটাই গুরুত্বপূর্ণ।’

যদিও পরবর্তীতে হাইকোর্ট ইমরানের গ্রেপ্তারকে আইনসঙ্গত বলেই ঘোষণা করেন।

আরও গোলমাল

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, যার বিরুদ্ধে ইমরান খানের প্রতি দুর্বলতা থাকার অভিযোগ আছে এক নির্দেশে এ মাসে পাঞ্জাব বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির আদেশকে অগ্রাহ্য করে সেনা সমর্থিত বর্তমান শাহবাজ শরিফ সরকার দেশের আর্থিক অবস্থার ওজর তুলে জানিয়ে দেয়, অক্টোবরের আগে কোনোমতেই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। আসলে নির্বাচনে ইমরানের দল জিতলে (যার সম্ভবনা বেশি) শাহবাজ শরিফ সরকার ও সেনাবাহিনী উভয়েই বেকায়দায় পড়বে, এটা জানা কথা।

ভবিষ্যৎ কী

ডনের সম্পাদকীয়তেই বলা হচ্ছে, বর্তমান সামরিক নেতৃত্ব যত দৃঢ়ভাবেই চাক না কেন, এই রাজনৈতিক ট্রপিজের খেলায় তাদের ভূমিকার কথা সাধারণ মানুষকে ভোলাতে, তা এত সহজ হবে না। কারণ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে এই ধারণা (পাকিস্তানের) মানুষের মধ্যে গেড়ে বসেছে। আর তাই সরকারেরও উচিত ছিল ‘দুর্নীতি’ নামের সহজ রাস্তায় না হেঁটে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া। নির্বাচন যত পেছাবে, মানুষ যত মূক থাকবে, ততই এই সংঘাত রাষ্ট্র ও দেশবাসীর মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে থাকবে।