এক হত্যাকাণ্ডেই চরম তিক্ততা শুরু হয়ে যায় ভারত-কানাডা কূটনীতিক সম্পর্কে। এর জেরে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এখন তলানিতে। জুন মাসে শিখপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ড নিয়েই এত উথালপাতাল। এই হত্যাকাণ্ডে ভারতকে এতটা ঝামেলা পোহাতে হয়নি। তবে এবার হয়তো ছাড় নেই আর। আমেরিকায় আরেক শিখনেতাকে হত্যাচেষ্টার পর ভারত সরকার বেশ বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
নিউইয়র্ক শহরে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। এই অভিযোগে মার্কিন ফেডারেল আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বুধবার এক ভারতীয়কে অভিযুক্ত করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, এই হত্যাচেষ্টায় নিখিল গুপ্তা নামের ওই ব্যক্তিকে ভাড়া করেছিলেন এক ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা। তবে সেই ভারতীয় কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আমেরিকার অভিযোগ—৫২ বছর বয়সী নিখিল গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। গত মে মাসে এ কাজের জন্য নিখিলকে নিয়োগ দেন ভারত সরকারের ওই কর্মকর্তা।
অভিযোগে বলা হয়, পান্নুনকে হত্যার জন্য আততায়ীর খোঁজ পেতে নিখিল এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই ব্যক্তি আমেরিকার মাদক বিভাগের একজন ‘আন্ডার কভার এজেন্ট’ ছিলেন বলে জানা গেছে। সেই ব্যক্তি একজন সম্ভাব্য আততায়ীর সঙ্গেও নিখিলের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন। হত্যাকাণ্ডের জন্য মোট ১ লাখ ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
এই মামলার সঙ্গে যুক্ত আমেরিকার বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, নিউইয়র্কে ভারত সরকারের নিষিদ্ধঘোষিত খালিস্তানপন্থী সংগঠন শিখস ফর জাস্টিস (এসএফজে) পরিচালনায় যুক্ত আছেন গুরপতবন্ত সিং পান্নুন। ‘খালিস্তান’ নামের একটি শিখ রাষ্ট্রের দাবি নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। এরই মধ্যে এ নিয়ে গণভোটেরও আয়োজন করে ফেলেছে তারা।
এই খালিস্তানপন্থী নেতাকে হত্যাচেষ্টা বানচাল করে দেয় আমেরিকা। নিখিল গুপ্তাকে গত জুন মাসে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর সঙ্গে হত্যাচেষ্টায় জড়িত হিসেবে একজন ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তার তথ্যও জানায় আমেরিকা। তবে সেই কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
তবে আমেরিকা একেবারে কিছুই জানায়নি—এমন নয়। ওয়াশিংটন বলছে, ওই ভারতীয় কর্মকর্তা একজন ‘সিনিয়র ফিল্ড অফিসার’। তিনি গোয়েন্দা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। ভারতে বসে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন গুপ্তহত্যার পরিকল্পনায় তিনি নেতৃত্ব দেন।
হত্যাচেষ্টার বিষয়ে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমেরিকার মাটিতে আমাকে হত্যাচেষ্টা মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এটি আমেরিকার সার্বভৌমত্বকে আঘাত করে। কানাডায় হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই ঘটনা জড়িত।’
এ ব্যাপারে ভারত সরকারের মন্তব্য চেয়েছিল সিএনএন। তবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত জুনে কানাডায় শিখপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারকে হত্যা করা হয়। কানাডার সরকারের অভিযোগ ছিল—এই হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকার জড়িত। তবে বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে ভারত।
আমেরিকার প্রসিকিউটররা বলছেন, দুজনই শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হওয়ায় নিজ্জার ও পান্নুন একে অপরের সহযোগী ছিলেন। নিজ্জারকে হত্যার একদিন পর গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যা করতে যাওয়া সম্ভাব্য ‘হিটম্যানকে’ গুপ্তা বলেছিলেন, ‘নিজ্জারও আমাদের টার্গেট ছিল। আমাদের আরও অনেক টার্গেট আছে।’
তবে গুপ্তা তখনো জানতেন না, যে হিটম্যানকে ভাড়া করছেন, তিনি আইনের লোক। ওয়াশিংটন বলছে, এর আগে পান্নুনের ঠিকানা, ফোন নম্বর ও প্রতিদিনের রুটিন গুপ্তাকে দিয়েছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। এমনকি নিজ্জারের মরদেহের একটি ভিডিও তাঁকে পাঠানো হয়। এরপরই হিটম্যানকে দ্রুত হত্যার তাগিদ দেন গুপ্তা। তবে দুই দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনা চলাকালে এই হত্যাকাণ্ড না ঘটাতে বলা হয়।
এসব অভিযোগের পর ভারত সরকার কিছুটা বেকায়দায় পড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট বাইয়ার বলেন, ‘আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না, এমন হতে পারে। বিশেষ করে যখন দুই দেশের মধ্যে এত ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এটা বোকার মতো কাজ হয়ে গেল।’
যদিও মার্কিন বিদেশনীতির বিশেষজ্ঞ উইলসন কেন্দ্রের বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, মোদির সরকার সবসময় নিজেদের শক্তি দেখাতে চায়। বিশ্বের যেকোনো জায়গায় হুমকি মনে হলে, তা নির্মূল করতে চায়। আর আমেরিকা এখন ভারতকে অনেক তোয়াজ করছে। বিশেষ করে চীনকে টেক্কা দেওয়ার জন্য। এবার পান্নুন খুনে ভারতের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পেয়েছে আমেরিকা। দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এই ঘটনা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে ভারতের সাবেক কূটনীতিক বিবেক কাটজু বলেন, ‘মতপ্রকাশের নামে অন্য দেশে বসে ভারতবিরোধী কার্যকলাপ কখনোই বরদাস্ত করা হবে না। এটা কানাডার পাশাপাশি আমেরিকাও ভালোভাবে জানে। ওয়াশিংটনও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।’