সমুদ্রপথে মাদক পাচারকে কারণ দেখিয়ে ভেনেজুয়েলার সমুদ্রসীমার আশপাশে গত সেপ্টেম্বর থেকেই হামলা চালিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ভেনেজুয়েলার আশপাশে কয়েক হাজার সৈন্য ও যুদ্ধজাহাজও ভিড়িয়ে রেখেছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলা থেকে অভিযোগ আসছে, আমেরিকার মূল লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
এর মধ্যে হঠাৎ খবর এসেছে, গত নভেম্বরেই এক ফোন কলে কথা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট মাদুরোর। গতকাল রোববার ট্রাম্প নিজেই সেটি নিশ্চিত করেছেন। কী কথা হয়েছে, সে নিয়ে অবশ্য দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানায়নি।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম মায়ামি হেরাল্ডকে সূত্র জানিয়ে ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ফোনে মাদুরো ক্ষমতা ছাড়ার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন ট্রাম্প। মাদুরো তাতে রাজি হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক শর্ত দিয়েছিলেন, যা ট্রাম্প মানেননি।
দুই পক্ষের যে ফোনে কথা হয়েছে, গতকাল রোববার সেটি নিশ্চিত করে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘(আলোচনা) খুব ভালো বা খারাপ হয়েছে কোনোটাই বলব না আমি, একটা ফোন কলই হয়েছে এটাই বলা যায়।’
গার্ডিয়ান লিখেছে, ফোনে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলা দুই পক্ষের কেউই কিছু জানায়নি। তবে ফোন কলটি গত ২১ নভেম্বর হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
ফোনে কী কথা হয়েছে, সূত্রের মারফতে সেটা মায়ামি হেরাল্ড তুলে ধরেছে বলে জানাচ্ছে গার্ডিয়ান। সেখানে বলা হয়েছে, মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়ার কথা ‘সোজাসুজি বলে দিয়েছেন’ ট্রাম্প। ‘আপনি নিজেকে এবং কাছের মানুষদের বাঁচাতে পারবেন, তবে সেটার জন্য আপনাকে এখনই দেশ ছাড়তে হবে’ – ট্রাম্প মাদুরোকে এমনটাই বলেছেন বলে ‘মায়ামি হেরাল্ডকে’ উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে গার্ডিয়ান। মাদুরো, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে ‘সেইফ প্যাসেজ’ দেওয়ার নিশ্চয়তাও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তবে শর্ত ছিল, যদি মাদুরো ‘তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করেন।’
তবে মাদুরো সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হননি, বরং ট্রাম্পকে একের পর এক পাল্টা কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানাচ্ছে গার্ডিয়ান। শর্তের মধ্যে ছিল, বিশ্বজুড়ে তাঁকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় রাখা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছেড়ে দিলেও সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ মাদুরোর হাতে থাকা…।
এরপর ট্রাম্প আর মাদুরোর মধ্যে সরাসরি আর কোনো আলাপ হয়নি। তবে গত সপ্তাহে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার আকাশপথ ‘পুরোপুরি বন্ধ’ ঘোষণা করার পর মাদুরো দ্বিতীয় আরেকটি ফোন কলের অনুরোধ করেছিলেন বলে মায়ামি হেরাল্ডকে সূত্র জানিয়ে লিখেছে গার্ডিয়ান। তবে সে অনুরোধের বিপরীতে আমেরিকার দিক থেকে কোনো সাড়া মাদুরো প্রশাসন পায়নি বলেও জানিয়েছে মায়ামি হেরাল্ড। এ-ও জানিয়েছে, প্রথমবারের ফোনকলটি হয়েছে ব্রাজিল, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায়।
তবে গার্ডিয়ান লিখেছে, মাদুরোকে আলটিমেটামের পরও বড় আকারের সামরিক আগ্রাসনের পথে ট্রাম্প আসলেই হাঁটবেন কি না, এ নিয়ে সংশয় আছে বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই। ভেনেজুয়েলার প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, এমন একটি সূত্র গত মাসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, ‘মাদুরো এবং তাঁর বাহিনীর বেশিরভাগ লোকই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এই হুমকিকে ধাপ্পাবাজি হিসেবেই দেখছে।’
২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে মাদুরো চাপের মুখে বেশ কয়েকবারই পড়েছেন। ট্রাম্পের প্রথম দফায়ও ‘চূড়ান্ত চাপ’ সয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দেখেছেন, অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়তে দেখেছেন, ২০১৮ সালে তাঁকে হত্যাচেষ্টাও হয়েছে। গত বছর বিতর্কিত নির্বাচনে মাদুরো জিতে স্বপদে বহাল থাকলেও আসলে তাঁর দল হেরে গেছে বলেও দাবি করে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম।
মাদুরো এবং তাঁর বিরোধীদের মধ্যে ঝামেলা মেটানোর পথে শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো কলম্বিয়ার কার্তাখেনা দুই পক্ষের আলোচনার জন্য ভালো জায়গা হতে পারে বলে প্রস্তাব করেছেন।
এদিকে আমেরিকার আগ্রাসনের মুখে গতকাল রোববার তেল ও জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের উদ্দেশে চিঠিতে মাদুরো লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুত, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড়, সেটিকে দখলে নিতে চায় সামরিক শক্তির প্রাণঘাতী প্রয়োগের মাধ্যমে।’