ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপ: পুতিন ইরানের দিকও দেখলেন, সুযোগে নিজেরটাও আদায় করলেন  

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোমবার ফোনে ইরান যুদ্ধ ও ইউক্রেনে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফোনালাপটা হলো এমন এক সময়ে, যার কয়েক ঘণ্টা আগেই পুতিন এই বলে সতর্ক করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে মাথাচাড়া দিতে থাকা জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ইরানে সংঘর্ষের কারণে তেলের দাম বাড়তে বাড়তে গতকাল সোমবার দাঁড়ায় ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তবে ক্রুড অয়েলের এই দাম মঙ্গলবার আবার কিছুটা কমে যায়। এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ার বাজারগুলোও ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেখিয়েছে।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, ট্রাম্প পুতিনকে ফোন করেছেন এবং এ বছর তাদের প্রথম ফোনালাপটাতে আলোচনা হয়েছে ইরানে যুদ্ধটা দ্রুত শেষ করা নিয়ে রাশিয়ার পরিকল্পনা, ইউক্রেনে সামরিক পরিস্থিতি এবং ভেনেজুয়েলার ঘটনা বিশ্ব তেলের বাজারে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, এসব নিয়ে।

ট্রাম্প ফ্লোরিডার নিজের গলফ ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ফোনালাপ নিয়ে বলেন, ‘পুতিনের সঙ্গে আমার ফোনালাপটা খুব ভালো হয়েছে।’ যোগ করেন, পুতিন ইরান নিয়ে সাহায্য করতে চাইছেন। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, “ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা তাড়াতাড়ি শেষ করার মাধ্যমে আপনি আরও বেশি সহায়তা করতে পারেন। সেটাই বেশি সহায়ক হবে।’”

এর আগে পুতিন বলেছিলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। তিনি সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে এই প্রণালির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল তেলক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক, সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস রিজার্ভও তাদের। সেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বলেছেন, ইউরোপীয় ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ব্যবস্থায় ফিরতে রাজি হলে রাশিয়াও তাদের সঙ্গে আবার ব্যবসা করতে রাজি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কমছে?

তিনজন উৎসের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কমানোর বিষয়ে ভাবছে। শুধু নির্দিষ্ট কিছু দেশকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ই নয়, বরং রাশিয়ার তেলের ওপর আরও অনেক ধরনের ও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা কমানোর কথাও ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে ভারতকে কোনো শাস্তি বা শুল্কের ভয় ছাড়াই রাশিয়া থেকে তেল কেনার অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পর বিশ্ব বাজারে তেলের জোগান বাড়ানো। তবে এই পদক্ষেপের ঝামেলাটা হলো, এটি অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ রাশিয়াকে ইউক্রেনে যুদ্ধে ব্যয় করার মতো অর্থে যাতে টান পড়ে, সে জন্যই এই নিষেধাজ্ঞাগুলো দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা মানে তো রাশিয়ার হাতে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালানোর মতো অর্থ বেড়ে যাওয়া।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তেলের দাম কমানোর স্বার্থে (রাশিয়ার) তেলের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু শাস্তি সাময়িকভাবে তুলে দিচ্ছি। কিছু দেশের ওপর শাস্তির ঘোষণা ছিল, আমরা সেই শাস্তিগুলো সরিয়ে দেব যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়। তারপর কে জানে, হয়তো আর শাস্তি দিতে হবে না… তখন কত শান্তিই না থাকবে! তবে যখন প্রয়োজন হবে, মার্কিন নৌবাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারকে সুরক্ষা দেবে।’

গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতকে যে সাময়িক ছাড় দিয়েছে আমেরিকা, সে অনুযায়ী তারা সমুদ্রে ভাসতে থাকা ট্যাংকার থেকে রাশিয়ার ক্রুড তেল কিনতে পারবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমার প্রভাব সামলানো যাবে।

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও রাশিয়ার তেল শাস্তিমুক্ত করতে পারে।

রাশিয়ার বিশেষ রাষ্ট্রদূত কিরিল দিমিত্রিভ বলেছেন, শনিবার তিনি এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

ক্রেমলিন মঙ্গলবার জানিয়েছে, রুশ তেলের ওপর শাস্তি তুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তবে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও এই তেল কেনার কারণে শাস্তির প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে কীভাবে ও কতটুকু পড়ছে, সেটি দুই নেতাই বোঝেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।