ভারতের আইকনিক শিল্পপতি ও দেশটির সবচেয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী টাটা সন্সের ইমেরিটাস চেয়ারম্যান রতন টাটা গত বুধবার রাতে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। ৮৭ বছর বয়সী এই ধনকুবেরের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন তাঁর বিশ্বস্ত সহকারী ও প্রিয় বন্ধু শান্তনু নাইডু।
শোকপ্রকাশ করেছেন মুকেশ অম্বানী, আনন্দ মাহিন্দ্রা, হর্ষ গোয়েন্কার মতো ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল। তবে শান্তনু ছিলেন রতন টাটার নিকটতমদের মধ্যে অন্যতম।
পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে দেওয়া একটি পোস্টে ৩০ বছর বয়সী শান্তনু লিখেছেন, ‘রতন টাটার মৃত্যুতে এই বন্ধুত্বে যে ছেদ পড়েছে তা আমি আমার বাকি জীবন ধরে পূরণ করার চেষ্টা করব। ভালোবাসার জন্য যে মূল্য চোকাতে হয় তা হল দুঃখ। বিদায়, আমার প্রিয় বাতিঘর।’
কে এই শান্তনু
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, রতন টাটাকে তাঁর অফিসের কাজে নিয়মিত সাহায্য করতেন শান্তনু। এ ছাড়া ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রামের কোথায় কোন হ্যাশট্যাগ দিতে হবে, কোন ইমোজির মানে কী, এ সব ব্যাপারেও রতনকো সাহায্য করতেন তিনি। শান্তনুর উৎসাহেই নিয়মিত ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করতেন রতন টাটা। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী পাঁচ লাখ পার হওয়ার পেছনে শান্তনুর অবদান রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।
জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসাই এই দুই অসমবয়সী মানুষকে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিল। তাঁদের বন্ধুত্বের বয়স ১০ বছর। ২০১৪ সালে প্রথম দেখা হয়েছিল দুজনের। ওই বছর শান্তনু পথকুকুরদের গাড়ি চাপা পড়া থেকে রক্ষা করার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন শান্তনু। সেই উদ্যোগে মুগ্ধ হয়ে শান্তনুকে তাঁর হয়ে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান রতন টাটা।
এরপর রতন টাটার এক জন্মদিনে তাঁর পাশে দেখা যায় মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুলের এক ছিপছিপে তরুণকে। তিনিই শান্তনু নাইডু।
যেভাবে রতন টাটার সঙ্গে পরিচয়
শান্তনু একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। পড়াশোনা করেছেন পুণে বিশ্ববিদ্যালয়ে। টাটাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের পুরনো জানাশোনা থাকলেও শান্তনুর পরিবারের কেউ কখনও রতন টাটার সঙ্গে সরাসরি কাজ করেননি।
জুনিয়র ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে টাটা এলেক্সিতে কাজ শুরু করেন শান্তনু। তখন টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান ছিলেন রতন টাটা। তাঁর সঙ্গে তখনও দেখা হয়নি তরুণ শান্তনুর।
সেই সময়েই শান্তনু খেয়াল করেন তাঁর অফিস চত্বরে প্রায়ই কিছু কুকুর গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। ঘটনাগুলি ঘটে মূলত রাতের দিকেই। পশুপ্রেমী শান্ততু তখন পথচলতি গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। কথা বলে জানতে পারেন, রাতে গাড়ি চালানোর সময় কুকুরগুলোকে চট করে দেখতেই পান না চালকেরা। ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে।
শান্তনু তখন এই সমস্যার সমাধান হিসেবে রাস্তার কুকুরদের গলায় আলো জ্বলা কলার পরানোর সিদ্ধান্ত নেন, যাতে রাতের অন্ধকারেও তাদের দেখতে পাওয়া যায়।
কিন্তু কলার বানাবে কে? কেই বা পরাবে? অফিসের কাজ সামলে একার পক্ষে এত কাজ করা সম্ভব নয়। পরে রাস্তার কুকুরদের দেখভালের জন্য সমমনস্কদের নিয়ে তৈরি করে ফেললেন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘মোটোপজ়’। এই ‘মোটোপজ়’-ই জীবন বদলে দেয় শান্তনুর।
শান্তনুদের এই উদ্যোগ পুণের টাটা এলেক্সি কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ে। সংস্থার নিউজ লেটারে জায়গা করে নেয় ঘটনাটি। নজরে পড়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান রতন টাটারও।
রতন নিজেও পশুপ্রেমী। তাঁর সংস্থার এক কর্মীর এমন উদ্যোগের কথা জেনে রতন নিজেই যোগাযোগ করেন শান্তনুর সঙ্গে। তাঁদের কাজকর্মের বিস্তারিত জানাতে বলেন। এরপর শান্তনুর সঙ্গে দেখা হয় রতন টাটার।
এরপর হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান শান্তনু। তবে ই–মেইলে যোগাযোগ থাকে রতন টাটার সঙ্গে। যেদিন শান্তনুর গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়, সেদিন সোজা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান রতন টাটা। সে দিনই শান্তনুকে তাঁর সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। রতন টাটার ব্যক্তিগত বিজ়নেস অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ শুরু করেন শান্তনু। এরপর এই দুজন অসমবয়সী মানুষের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়।
সেই বন্ধুত্বে ছেদ পড়ল। গত বুধবার রাতে প্রয়াত হলেন শিল্পপতি রতন টাটা।