কার্যত সৌদি আরবের শাসকই বলা হয় তাঁকে। সেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে শুধু কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে, বরং অঞ্চলটির শক্তির ভারসাম্য একেবারে বদলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে জানিয়েছেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একটি দৃঢ় ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর লক্ষ্য ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে ভেঙে দেওয়া। তাঁর মতে, তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বগত হুমকি। এই হুমকি শুধু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, বরং শাসন পরিবর্তনের মাধ্যমেই তা মোকাবেলা করতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আংশিকভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বরাবরই ইরানকে একটি কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল হয়তো একটা দুর্বল হয়ে পড়া ইরান বা অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল ইরান মেনে নিতে পারে। কিন্তু সৌদি আরবের আশঙ্কা, ইরান যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে তা আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে, বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী শক্তিশালী হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে।
ভিন্ন অবস্থান
ব্যক্তিগতভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান থাকলেও, প্রকাশ্যে সৌদি আরব তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এক সরকারি বিবৃতিতে দেশটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলেছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষা করা এবং চলমান হামলা বন্ধ করা।
মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে যে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান, তাতে ইতিমধ্যে অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে পড়া এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই পথ দিয়েই উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ তেল রপ্তানি হয়।
সামরিক বিকল্প ও যুদ্ধের ঝুঁকি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ বিন সালমান আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাম্পকে। এর মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের কথাও রয়েছে। একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এমন পদক্ষেপ বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করবে এবং এতে ঝুঁকিও অনেক।
ট্রাম্প কখনো কখনো উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ইরানের সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’র কথাও বলেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে ধারাবাহিকতা নেই। অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, অর্থবহ কোনো আলোচনা চলছে না।
অর্থনীতি ও তেলের ধাক্কা
এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। ইরানের হামলায় তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। সৌদি আরব ও তার মিত্ররা বিকল্প পাইপলাইন তৈরি করলেও সেগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রিয়াদের জন্য বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার নয়, অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা - যার লক্ষ্য সৌদি আরবকে বিনিয়োগ ও পর্যটনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা - তা অনেকটাই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এই পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশটি ইতিমধ্যেই আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে।
কৌশলগত হিসাব
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি নেতৃত্ব এখন দুটি ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ করলে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আবার দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরব নিজেই হামলার মুখে পড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
২০১৯ সালে ইরান-সম্পর্কিত হামলায় সৌদি তেল স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার ফলে সাময়িকভাবে দেশটির তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। সেই অভিজ্ঞতা এখনো রিয়াদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করেছিল সৌদি আরব। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই অগ্রগতি কার্যত নষ্ট করে দিয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বিশ্বাসের সম্পর্ক এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন সামরিক নেতা নিহত হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে শাসন পরিবর্তন সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি এবং হয়তো জেতা কঠিন এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।