ইসরায়েলের ‘শক্তির’ অহংকার ইরানে মিলিয়ে গেল!

মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি বিশ্বাস ছিল, যা বছরের পর বছর কেউ ভাঙতে পারেনি। তা হলো—ইসরায়েলের আকাশে ঢুকে সফলভাবে হামলা চালানো প্রায় অসম্ভব। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন—সব মিলিয়ে ইসরায়েলকে ধরা হতো এক অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি হিসেবে।

কিন্তু শেষ কয়েক মাসের এই যুদ্ধের পর সেই বিশ্বাসেই কি ফাটল ধরেছে? কারণ এখন শুধু ইরানের হামলা নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন—এই সংঘাত ইসরায়েলের বহু বছরের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মস্কোভিত্তিক প্রবীণ সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জন হেলমারের মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু ক্ষয়ক্ষতি নয়—বরং মানসিক ও কৌশলগত। তাঁর ভাষায়, ইরান একাধিকবার এমন হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে, যা ইসরায়েলের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করেছে।

ইসরায়েল এবং তার মিত্ররা এসব ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করলেও, বাস্তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। কারণ এতদিন যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যত অভেদ্য বলা হতো, সেটি যে শতভাগ অপ্রবেশযোগ্য নয়—এই বার্তাটাই এখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

আর এখানেই শেষ নয়। হেলমারের মতে, যুদ্ধ যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—ইসরায়েল একা এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনা করতে পারছে না। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র সরবরাহ এবং সামরিক সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল ইরানের সামনে দাঁড়াতেই পারত না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে বড় মূল্য দিচ্ছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ বলছে, কয়েক মাসের সংঘাতে বিপুলসংখ্যক প্যাট্রিয়ট, থাড, টমাহক এবং অন্যান্য উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে।

একদিকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে, অন্যদিকে অস্ত্রের মজুতও ধরে রাখতে হবে। আর এখানেই ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তির কথা উঠে আসে। তা হলো হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ ইরানের হাতে থাকা এমন একটি কৌশলগত চাপের কেন্দ্র, যার প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়ে।

অন্যদিকে ইসরায়েল এখনো শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রও অঞ্চল ছাড়ছে না। কিন্তু এই যুদ্ধ একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—শুধু প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করা যায় না। আর ইরান এরই মধ্যে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে ফেলেছে।

অর্থাৎ, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো ধ্বংসস্তূপে নয়—বরং ভেঙে যাওয়া সেই ধারণায়, যেখানে মনে করা হতো ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্য কখনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না। আর সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন—যে সামরিক আধিপত্যকে এতদিন অটুট বলে মনে করা হতো, সেটি কি সত্যিই আগের মতো আছে? নাকি ইরান এই যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণে এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা আর সহজে অস্বীকার করা যাবে না?