একটি জলপথ—কিন্তু এখন সেটাই হয়ে উঠেছে পুরো যুদ্ধের সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির জায়গা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্নে এবার এমন শর্ত সামনে আনল ইরান, যা মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেই সহজ নয়। ওয়াশিংটন চায় হরমুজ খুলুক। আর তেহরান বলছে—শুধু হরমুজ খোলার আলোচনা নয়, আগে বদলাতে হবে আমেরিকার আচরণ। অর্থাৎ, প্রণালির চাবি এখনো ইরানের হাতেই—আর সেই চাবি ফেরত দিতে তেহরান সামনে রাখছে একের পর এক কঠোর শর্ত।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কখনো ইরানকে হুমকি দেওয়া যাবে না এবং ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। শুধু এটুকুই নয়। হরমুজ খুলতে ইরানের দাবিগুলো আরও বড়। প্রথমত, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। তৃতীয়ত, যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ দিতে হবে এবং সবশেষে ইরানের ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে ও বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ‘নিঃশর্তভাবে’ ছাড়তে হবে। আর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শর্ত—যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে আর ইরানকে সামরিক হুমকি দেওয়া যাবে না।
এই দাবিগুলো সামনে আসার পর হরমুজ ইস্যুতে চলমান আলোচনাই এখন নতুন মোড় নিয়েছে। কারণ এর মধ্যেই ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ পরিচালনা নিয়ে আলাদা একটি সমঝোতার আলোচনা এগোচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, নৌযান চলাচল এবং বিশেষ করে কোন পথ দিয়ে জাহাজ চলবে—এ বিষয়ে সমঝোতা প্রায় হয়ে এসেছে। তবে হরমুজ খুলে দেওয়া শুধু নৌপথ নির্ধারণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের নিরাপত্তা দাবিও।
আর এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় জটিলতা। যুদ্ধের আগে হরমুজ ছিল আন্তর্জাতিক নৌপথ। যুদ্ধের পর থেকে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে ইরান এখন হরমুজকে শুধু একটি নৌপথ হিসেবে দেখছে না। তেহরানের কাছে এটি চাপ তৈরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যাটা এখানেই। হরমুজ খুলতে হলে ইরানের সঙ্গে কোনো না কোনো সমঝোতায় যেতে হবে। কিন্তু তেহরানের বর্তমান দাবিগুলো মেনে নেওয়া মানে শুধু একটি জলপথ খুলে দেওয়া নয়—এর অর্থ হতে পারে যুদ্ধের পর ইরানের বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্জন মেনে নেওয়া। অন্যদিকে, শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘাত আরও দীর্ঘ হতে পারে, বাড়তে পারে অর্থনৈতিক চাপও।
তাই হরমুজ এখন শুধু একটি প্রণালি নয়। এটি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শক্তির পরীক্ষার কেন্দ্র। আর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ছয় দাবির কতটা মেনে নিয়ে ওয়াশিংটন হরমুজ খুলতে রাজি হবে, আর কতটা চাপ ধরে রাখবে তেহরান। কারণ এই যুদ্ধে কে কতটা শক্তিশালী—তার পরের হিসাব হয়তো নির্ধারিত হবে যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, হরমুজের জলপথেই।