রাত পোহালেই পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। আর এ নির্বাচনে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া তার দল তেইরিক ই ইনসাফের(পিটিআই) অনেক শীর্ষ নেতা পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যেই নির্বাচনে শুধু অংশই নয়, নির্বাচনে প্রচারেও অংশ নিচ্ছে ইমরান খান। এ সংকটে নির্বাচনী প্রচারের ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে ইমরান খানের দল পিটিআই। প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেকটা গেরিলা কৌশলে অপ্রচলিত প্রচার চালিয়েছে দলটি।
যেহেতু ইমরান খানের সভা–সমাবেশে সরাসরি অংশ গ্রহণের সুযোগ ছিল না, তিনি কারবন্দি অবস্থায় রয়েছেন, তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে প্রচার চালিয়েছে ইমরান খান। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পিটিআইয়ের পক্ষে এ প্রচারের নেতৃত্ব দিয়েছে শিকাগো ভিত্তিক একটি দল। ওই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন জিবরান ইলিয়াস।
গত ডিসেম্বরে কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে তাঁর দলের আইনজীবী দেখা করেন। এসময় ইলিয়াস ও তার দল পিটিআইয়ের ওই আইনজীবীর মাধ্যমে ইমরান খানকে একটা বার্তা পাঠান।
জিবরান ইলিয়াস কাতার ভিত্তিক আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের দলের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন দেখেছি। আমরা দেখেছি মানুষ কতটা হতাশ। আমরা দেখেছি আমাদের সমাবেশ কর্তৃপক্ষ কি ভাবে ভেঙে দিয়েছে। এরপর থেকে 'ভার্চুয়াল সমাবেশ' এর বিষয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে। তবে ভার্চুয়াল সমাবেশের বিষয়ে ইমরান খানের কোনো ধারণা ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন আমরা জুমে কিছু করব। কিন্তু আমরা ব্যাখ্যা করেছি যে আমরা কী করব। এরপর তিনি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন।’
গত ১৭ ডিসেম্বর পিটিআই স্ট্রিমইয়ার্ড নামক একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম জুড়ে প্রায় ৫০ লাখের বেশি মানুষকে অনলাইনে সমবেত করতে সক্ষম হয়। আর এটিই ছিল পাকিস্তানে যুক্তিযুক্তভাবে প্রথম ভার্চুয়াল সমাবেশ।
সেখানেই থেমে থাকেনি ইলিয়াস ও তার দল। ইমরান খান তিন মাস ধরে কারাগারে থাকায় জনগণ তার কথা শুনতে পায় না। এরপরে আমাদের ধারণা আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত একটি বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন ইমরান। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘চ্যাটবট’ ব্যবহার করে ইমরানের কণ্ঠ নকল করে চার মিনিটের বক্তব্য তৈরি করা হয়। চার মিনিটের ওই বক্তব্য ‘ভার্চুয়াল সমাবেশে’ প্রচার করা হয়। সেই বক্তব্য অনলাইনে প্রকাশ করা হওয়ার পর দেশব্যাপী ব্যপক সাড়া ফেলে।
পিটিআইয়ের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রধান জিবরান ইলিয়াস বলেন, ‘পিটিআই কীভাবে দেশের প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে সচেতন দল হিসাবে রয়ে গেছে তার এটি একটি বড় উদাহরণ। পিটিআই একটি বিধ্বংসী ক্র্যাকডাউনের মুখোমুখি হয়েছে, এমনকি বৃহস্পতিবার নির্বাচনে তার দলীয় প্রতীক ‘ক্রিকেট ব্যাট’ ব্যবহার করতেও বাধা দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশন থেকে। এমনকি পিটিআই দলের নাম ব্যবহারেও না করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে হচ্ছে পিটিআই–এর দলের নেতাদের। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইনে ডিজিটাল টুলস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সহায়তা করছে। যদিও এ বিষয়গুলোকে অনেকে সমালোচনা করছেন।’
সারা দেশে স্বাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশেরও কম, প্রার্থী বা তাদের পছন্দের দলকে চিহ্নিত করতে জনসাধারণের কাছে নির্বাচনী প্রতীক বা ছবি শনাক্তকারীরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মনে করে। আগামীকালকের নির্বাচনে তাই দলটি তাদের গেরিলা কৌশল জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান ইলিয়াস। এক রাতের মধ্যে আমাদের দল একটি অনলাইন পোর্টাল স্থাপন করেছে। যেখানে ব্যবহারকারীরা প্রবেশ করতে পারবেন এবং তারা প্রার্থীর নাম এবং তাদের প্রতীক পাবেন।’
এদিকে পিটিআইয়ের আরেকজন নেতা বলেন, লাহোরে নির্বাচনে প্রচারের জন্য আমরা হোয়াটসঅ্যাপের ওপর নির্ভর করছি। আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও নির্দেশনা আদান–প্রদান করছি।
পাকিস্তানের ৬০ শতাংশ ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছর। যদি এ বয়সের ভোটারদেরকের টানতে চান তাহলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক, ইউটিউব ইত্যাদি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বলে জানান শিকাগো ভিত্তিক ওই দল।
ইলিয়াস বলেছেন যে, ‘তার দল পাকিস্তানের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল করেছে। যেখানে দলের অনুসারীরা ভোট দেওয়ার তথ্য পেতে পারে। আরেকটি "গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন", হলো একটি চ্যাটবট যা পিটিআই ইমরান খানের ফেসবুক প্রোফাইলে করা হয়েছে। এটি যেভাবে মানুষের সাথে জড়িত, তাতে মনে হচ্ছে আপনি ইমরান খানের সাথে কথা বলছেন। আপনি আপনার নেতাকে আপনার নির্বাচনী এলাকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে একটি বার্তা পাঠান, এবং তিনি উত্তর দেন কোথায় যেতে হবে এবং আপনাকে ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এটা মানুষকে অনুভব করায় যে, তারা সরাসরি ইমরান খানের সাথে কথা বলছেন।
ইলিয়াস জানান, ‘ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া ব্যপক এবং আমরা খুব আশাবাদী এটি ভোটে পরিবর্তন আনবে। আমি বিশ্বাস করি মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে কারণ তারা এই দমন-পীড়নের কারণে প্রচারণা বা প্রতিবাদে যোগ দিতে পারেনি। ভোট হবে আমাদের হতাশা দূর করার পথ।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দুর্নীতি-রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে গত আগস্ট থেকে কারাবন্দি রয়েছেন। এরই মধ্যে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন দেশটির জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইমরান খান কারাগারে থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে পিটিআই।