এনসিটির দায়িত্বে ডিপি ওয়ার্ল্ড, চট্টগ্রাম বন্দরে বড় পরিবর্তন আসছে?

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে। দেশের মোট বৈদেশীক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই সম্পন্ন হয় এই একটি বন্দর দিয়ে। কিন্তু এই বন্দর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বেশ কয়েকটি বড় অভিযোগ রয়েছে। এই যেমন, জাহাজ ও কনটেইনারের দীর্ঘ জট, দীর্ঘ সময় বন্দরে আটকে থাকা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় পিছিয়ে থাকা। তবে এবার চট্টগ্রাম বন্দরের এই চিত্রে কি বড় কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে?

প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল—নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি পরিচালনা ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর হাতে।  

দীর্ঘ ১৫ বছরের এই চুক্তিতে কী আছে? এতে বাংলাদেশের লাভ কতটা, আর বিতর্কই বা কোথায়? চলুন পুরো বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক। 

এনসিটি কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক, এনসিটি টার্মিনালটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত হয় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে একসাথে চারটি সমুদ্রগামী এবং একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভিড়তে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরের মোট চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি একাই হ্যান্ডেল করে প্রায় ৪৪ শতাংশ কনটেইনার। অর্থাৎ, গত এক বছরেই এই টার্মিনালে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানামা করা হয়েছে। এক কথায়, দেশের আমদানি-রপ্তানি সচল রাখার ক্ষেত্রে এনসিটি টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

১৫ বছরের চুক্তি: কী পাচ্ছে বাংলাদেশ?

চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে স্বাক্ষর করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এসা কাজিম। প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘ ১৫ বছরের এই চুক্তিতে বাংলাদেশ আসলে কী পাচ্ছে? এক্ষেত্রে চুক্তির মূল শর্তগুলো দেখে নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ। জমি, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং মূল সম্পদ সবকিছুর পূর্ণ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তথা বাংলাদেশ সরকারের হাতেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড শুধু পরিচালনার অধিকার পাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রাপ্তি। চুক্তির শুরুতেই অগ্রিম ফি হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পাবে বাংলাদেশ। এছাড়া প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

এরপর আছে রাজস্ব শেয়ার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতি কনটেইনারে নির্দিষ্ট মাশুল এবং বার্ষিক রাজস্ব শেয়ার পাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে। এছাড়া চুক্তিতে গুরুত্ব পেয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও। নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনসহ সকল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকল ঠিক আগের মতোই বহাল থাকবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ আছে। 

কেন বিদেশি অপারেটর?

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, দেশীয় অপারেটর থাকতে হঠাৎ ডিপি ওয়ার্ল্ড কেন? উত্তর লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক বন্দর দক্ষতার সূচকে। ২০২৫ সালের বিশ্বমানের বন্দর সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের ৪০০টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৩৬৪তম।

মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে বিশ্বমানের বন্দরে একটি জাহাজ অবস্থান করে ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টা, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দরে লেগে যায় আড়াই দিনেরও বেশি। চট্টগ্রামের সাথে তুলনাযোগ্য অন্যান্য বন্দরে কনটেইনার অবস্থানের সময় ২ দিনের কম হলেও চট্টগ্রাম বন্দরে তা ৯ দিনের বেশি।

জানা গেছে, এই ধীরগতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা বছরে হিসেব করলে দাঁড়ায় ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, কনটেইনারের জট মাত্র ১ দিন কমাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করে। বিশ্বজুড়ে মোট কনটেইনার চলাচলের প্রায় ১০ শতাংশ হয় তাদের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির এই আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে। 

দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও শ্রমিক আন্দোলন

তবে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিকে ইজারার এই সিদ্ধান্ত কিন্তু একদিনের নয়। ২০০৮ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা বাতিল হয়। ২০১৯ সালে আবুধাবিতে সমঝোতা স্মারকের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালে কাজে গতি আসে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন এবং দর-কষাকষি শেষ হয়। অবশেষে বিএনপি সরকারের আমলে এসে এই চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পেল।

তবে এই চুক্তিকে ঘিরে শুরু থেকেই রয়েছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা। বন্দর রক্ষা পরিষদ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে শুরু থেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। 

শ্রমিকদের দাবি, বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং সার্বিকভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ে হুমকি তৈরি হতে পারে। এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরের দিন রাজধানী ঢাকাতে একাধিক বাম রাজনৈতিক দল বিডা (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।

বন্দর বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা সুনির্দিষ্ট রেখে চুক্তির বিস্তারিত বিষয়াদি প্রকাশ্যে আনা হলে এ ধরনের বিভ্রান্তি ও বিতর্ক অনেকাংশে কমে যাবে।

বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়? 

সব মিলিয়ে, পতেঙ্গা টার্মিনালে সৌদির আরএসজিটি, লালদিয়ায় ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং এখন এনসিটিতে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড—বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের বড় বড় অপারেটরদের এই আগমন এক নতুন যুগের সূচনা করছে।

এখন দেখার বিষয়, এনসিটি টার্মিনালের দায়িত্বে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ বছরের যাত্রা চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আধুনিক, জটমুক্ত ও বিশ্বমানের বন্দরে রূপান্তর করতে পারে কি না। আপনার কী মনে হয়, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি টার্মিনালের দায়িত্ব নেওয়ায়, দেশের বাণিজ্যে কি ইতিবাচক গতি আসবে?

দেশের অর্থনীতির মূল হৃৎস্পন্দন বলা হয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই পরিচালিত হয় এই এক বন্দর দিয়ে। কিন্তু সম্প্রতি এই চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় এক আলোচনা ও...
‘চুলা জ্বলছে না, গ্যাস নেই’—অনলাইনে খুঁজলে এমন অসংখ্য নিউজের হেডলাইন মিলবে সহজেই। অথচ দেশে এলপিজি আছে যথেষ্ট, আমদানিও হয়েছে পর্যাপ্ত। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—গ্যাস গেল কোথায়?
একটি দেশ মাত্র কয়েক মাসে কিনে ফেলেছে এক হাজার টনেরও বেশি সোনা! যেন সোনার পাহাড় গড়ে তোলা হচ্ছে। দেশটি কি তবে বদলে দিতে চাইছে বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব–নিকাশ?
ভারতের জন্য আবারও বড় অর্থনৈতিক চাপের খবর! রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে ভারতের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর রাস্তা খুলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে...
আবুধাবি টেস্টে হ্যাটট্রিকসহ ৫ উইকেট শিকার হাসান মাহমুদের। বাংলাদেশের ৩৪৬ রানের জবাবে আফগানরা অলআউট ২৪০ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে বাংলাদেশের সংগ্রহ বিনা উইকেটে ৫ রান।
সাজেক থেকে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে অনিদিষ্টকালের অবরোধ পালন করছে সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি।
দেশে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বড় একটি অংশই বাজারে নেই। ফলে প্রেসক্রিপশন হাতে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ছুটেও মিলছে না অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এসব ওষুধ। উৎপাদকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা অনেক...
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াঘাট-বড়বাজার সংযোগ সড়কে গড়াই নদীর ওপর ‘শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু’ নির্মাণের দাবিতে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ...
লোডিং...

এলাকার খবর