সাইবার অপরাধ দমনের লক্ষ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খসড়া এখনো চূড়ান্ত না হলেও ১৩ সেপ্টেম্বর সর্বসাধারণের মতামতের জন্য সংশোধনী প্রস্তাব প্রকাশ করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন কিছু ধারা যুক্ত হচ্ছে, যা মতপ্রকাশ ও বাক স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর আশঙ্কা করছেন অধিকারকর্মীরা।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬ এর ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে খর্ব হবে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, এ আইনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্বাহী বিভাগ ও আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও আধিপত্য নিশ্চিত করা। এটি জনগণের অধিকার হরণের বড় হাতিয়ার হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘এই আইনের আল্টিমেট টার্গেট হচ্ছে একদিক থেকে নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতার আধিপত্য নিশ্চিত করা। এবং তাদের অধিনস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয়া জবাবদিহিহীনভাবে এবং বিচারিক নজদারির উর্ধ্বে থাকে। অন্য দিক থেকে এটাকে ব্যবহারের মাধ্যমে টার্গেটেড ভিন্নমত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা খর্ব করা। এর ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে খর্ব হবে। এটি জনগণের অধিকার হরণের বড় হাতিয়ার হবে। এই আইন দিয়ে মূলত সাইবার নজরদারি বাড়বে।’
সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ ছড়ানোর অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা দুটোই। মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন ও বুলিংয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি রাখা হয়েছে ৫ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয়ই।
ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হলে এসব অপরাধের শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার অনুমোদিত সংস্থা বা বাহিনীর কাছেও যেতে পারে।
গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও বুলিংয়ের সংজ্ঞা এবং কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অংশীজনদের মতামত না নিয়ে একতরফা সরকার নিয়ন্ত্রিত সাইবার সুরক্ষা কমিটির মত নিয়ে খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ টিআইবির।
সরকার কেন এ ধরনের আইন করছে তা বোধগম্য নয় বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। তিনি বলেন, ‘এইটা ভবিষ্যতে এমন হবে যে সরকার যাকে পছন্দ করে না তার একটা ফেসবুক স্টেটাস নিয়ে এই নির্যাতনটা করতে পারে। চাই যে তারা না করুক। মুশকিলটা হচ্ছে বোঝার বয়স থেকে আজ অবধি দেখেছি আমাদের এখানে আইনের শাসন চলে না, শাসকের আইন চলে। এবং যখন শাসকের আইন চলে তখন আইনের শাসনের মৃত্যু ঘটে, সংবিধান অকেজো হয়ে যায়। মানুষের অধিকার, মানুষের মর্যাদা একদম মাটিতে মিশে যায়। এই অ্যমেন্ডমেন্টগুলো পড়ে আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে।’
এ ধরনের নিবর্তনমূলক আইনের ফলে ঝুঁকির মুখে পড়ে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। কারণ কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও ইতিবাচক হবে না দাবি করে এমন আইন প্রণয়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।



