বিশ্বকাঁপানো হলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলার কথা নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি দেশের মানুষ। দশ বছর আগের এই ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামি বেকসুর খালাসের আবেদন করেছে উচ্চ আদালতে। বিচারিক আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিলেও হাইকোর্ট শাস্তি কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেন। আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় তাদের আবেদন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ জঙ্গি হামলায় নিহতের স্বজনরা।
২০১৬ সালের ১ জুলাই সন্ধ্যায় গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে আকস্মিক জঙ্গি হামলার ঘটনায় ১৭ বিদেশিসহ ২৯ জনের হত্যার ঘটনাটি দেশ-বিদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
জঙ্গিদের বশে আনতে প্রশিক্ষিত সেনা কমান্ডোদের দিয়ে 'অপারেশন থান্ডার বোল্ড' নামের ১২ মানিটের শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে ৫ জঙ্গি মারা গেলেও অক্ষত উদ্ধার করা হয় ৪ বিদেশিসহ ১৩ জিম্মি। অবসান হয় জঙ্গিদের ১২ ঘন্টার জিম্মি নাটকের।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০১৯ সালে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নব্য জেএমবি'র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ডেথ রেফারেন্সে আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন এ মামলার অন্যতম আসামী আসলাম হোসেন।
মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামী জেএমবি'র শীর্ষ নেতা শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ে বলেন, হলি আর্টজানে হামলায় ব্যবহৃত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কিনতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করা হয় ৩৯ লাখ টাকা। জঙ্গি হামলার ৩ বছর পর ২০১৯ সালে রাজশাহী থেকে গ্রেপ্তার হন শরিফুল।
সর্বশেষ গুম কমিশনের রিপোর্টের বর্ণণার ভিত্তিতে শরীফুলের বাবা'র দাবি মুম্বাই পুলিশ তার ছেলেকে ভারত থেকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে তুলে দেয় ডিজিএফআই'র হাতে। এরপর গুম করে রাখা হয় ৩ মাস।
শরিফুলের বাবা আব্দুল হাকিম বলেন, সে যখন ট্রেনে ছিল, হঠাৎ করে নাকি দিল্লির পুলিশ গিয়ে তার চোখ বন্ধ করে দেয়।
আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া মোট ৬ আসামীর বেকসুর খালাসের আবেদন এখন আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।
আসামীপক্ষের আইনজীবী আমিমুল এহসান জুবায়ের বলেন, 'যাদের বিচার হয়েছে, প্রসিকিউশনের মামলা অনুযায়ী তাদের কেউ স্পটে (ঘটনাস্থলে) ছিল না। তাহলে তারা সহযোগী ছিল। তো সহযোগীদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো বিধানই নাই।'
আপিল বিভাগের আইনজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, 'তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসছে, সে নাকি এ মামলায় যে আর্মস ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো ভারত থেকে সরবরাহ করেছে।'
এদিকে জঙ্গি হামলায় নিহতের পরিবার বলছে, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের সাজা কমানো এবং এখন খালাসের আবেদন ন্যায় বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নিহত এসি রবিউলের ভাই শামসুজ্জামান শামস জানান, যদি এই বিচারটা দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় তাহলে আমরাও যেমন আশ্বস্ত হই এবং আমরাও যেমন ন্যায়বিচারটা পাই, আমার মনে হয় যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের যে শাসন সেটাও কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পাবে।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি'র পরিচয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা চালিয়েছে।
হলি আর্টিজান বেকারিতে উগ্রবাদীদের হামলা বাংলাদেশকে দুটি পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। প্রথমত বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় সারা বিশ্বের কাছে। দ্বিতীয়ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমবারের মতো সন্ত্রাসবাদী হামলার সাথে উচ্চবিত্তের সংশ্লিষ্টতা পায়।


