দেশের আইনে বাবাকে শিশুর ‘স্বাভাবিক অভিভাবক’ হিসেবে গণ্য করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচর্যাকারী মাকে চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে স্কুলে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসা বা বিদেশভ্রমণের মতো নীতিগত ও প্রশাসনিক কাজে সন্তানের পক্ষে সই করার অধিকার পান না মায়েরা। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর এই জটিলতা কাটাতে পরিপূরক নীতি বা আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে ‘শিশুদের অভিভাবকত্ব সম্প্রসারণ প্রস্তাব-সিজিইপি’ আয়োজিত দ্বিতীয় সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সাংগঠনিক সহযোগিতায় ছিল নাগরিক কোয়ালিশন।
সংলাপে মারমা সমাজের প্রথাগত ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারের সদস্য লোটাস মারমা বলেন, ‘মারমা সমাজের প্রথাগত আইন আলাদা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৌখিক—মেয়েসন্তান হলে মা পান, ছেলে হলে বাবা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইনে স্বাভাবিক অভিভাবক বাবা। আবার কারবারি বা হেডম্যান ভিন্ন সিদ্ধান্তও নিতে পারেন, আর বোমাং সার্কেল মাকে অভিভাবকত্বের অধিকার দিতে পারে। বিরোধনিষ্পত্তি কারবারি থেকে হেডম্যান, সেখান থেকে সার্কেল চিফ, তারপর বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের দিকে এগোয়।’
আদালতের আদেশ পাওয়ার পরও মায়েদের সামাজিক অসহযোগিতা ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়—গত ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রথম সংলাপে উঠে আসা এই অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের সংলাপে আলোচ্য বিষয় ছিল ৫টি: আইনের ব্যাখ্যার ঘাটতি, অভিভাবকত্বের বাস্তবতা, প্রশাসনিক কাজের অগ্রগতি, আদালতের আদেশ কার্যকর না হলে করণীয় এবং আইনি স্বীকৃতির পর প্রয়োজনীয় সহায়তা।
সিজিইপি’র আহ্বায়ক দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘অভিভাবকত্বের যেকোনো প্রশ্নে শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণই রাষ্ট্র ও আইনের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত।’
সংগঠনটির গবেষণা প্রধান ও সমন্বয়ক তৃষিয়া নাশতারান জানান, তাঁদের এই উদ্যোগ মূলত তিনটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, মা-বাবা উভয়ের অভিভাবকত্বের অধিকার এবং শিশুর পরিচর্যার ধারাবাহিকতা।
সংলাপে শিশুর অভিভাবকত্ব নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘শিশুর অভিভাবকত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা নীতিনির্ধারকেরা সবসময় বুঝতে পারেন না; ফলে বিষয়টি এখনও অধরা রয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের শিশু আগামীর নাগরিক। শুরুতে পরিবার ও সমাজ শিশুকে সঠিকভাবে লালন না করলে বড় হয়ে তাকে অনেক কিছু ভুলে নতুন করে শিখতে হয়, যা মোটেও সহজ নয়।’
এছাড়াও আলোচকেরা কয়েকটি গোষ্ঠীর শিশুদের কথা বিশেষভাবে ভাবার আহ্বান জানান: পথশিশু, অনাথ ও রোহিঙ্গা শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, বাবার পরিত্যক্ত শিশু এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিশু, যাদের ক্ষেত্রে প্রথাগত ও রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে।
এদিন সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম ও মারদিয়া মমতাজ, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট রেহনুমা আহমেদ, সাংবাদিক সামসুদ্দোজা সাজেন, টিভি উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী, গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ এবং নাগরিক কোয়ালিশনের প্রতিনিধি সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন প্রমুখ।


