ইসরায়েল–ফিলিস্তিন দীর্ঘ সংঘাতের মূলে বর্ণবাদ, দখলদারি ও অবরোধ

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:২৬ পিএম

ইসরায়েলে গত শনিবার ভোর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে রকেট হামলা শুরু করে হামাস। জবাবে গাজায় টানা বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। পাল্টাপাল্টি হামলায় এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। 

এরই মধ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজা উপত্যকা পুরোপুরি অবরোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে পশ্চিম তীরের প্রবেশপথ। সাঁজোয়া যান, ট্যাংকসহ ভারী যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে অন্তত এক লাখ ইসরায়েলি সেনা। এ ছাড়া ৩ লাখ রিজার্ভ সেনাসদস্যকে তলব করা হয়েছে। 

হামাসের হামলা কয়েক দশকের ইসরায়েলি নিপীড়নের জবাব। ছবি: রয়টার্স সে যাই হোক। হামাসের আকস্মিক রকেট হামলার পাশাপাশি ইসরায়েলে ঢুকে বিভিন্ন এলাকায় লড়াই অনেককে বিস্মিত করেছে। হতভম্ব হয়েছে ইসরায়েলিরা।

অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন, দুটি কারণে হামাস এই মুহূর্তে এমন হামলা চালাচ্ছে। একটি হলো—ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। আর অপরটি হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ ঠেকানো। 

কিন্তু হামাসের এই হামলার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। অনেকে বলছেন হামাস ‘একতরফা’ ও ‘বিনা উসকানিতে’ ইসরায়েলে হামলা শুরু করেছে। কিন্তু এটা মুদ্রার একপিঠের গল্প। ফিলিস্তিনিরা অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অবরুদ্ধ গাজায় কয়েক দশক ধরে দিনের পর দিন ইসরায়েলের যে নিপীড়ন ও হামলার স্বীকার হয়ে আসছে, হামাসের হামলা তার জবাব। 

১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম ও গাজা দখলে নেয় ইসরায়েল। এর পর কয়েক দশক ধরে চলে ইসরায়েলি দখলদারি। তবে ১৯৯৩ সালে চির বৈরী ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নরওয়ের অসলোতে বৈঠক হয়। এর সূত্র ধরে ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তিতে সই করেন ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত ও সেই সময়ের ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন।

অসলো চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিরা স্বশাসনের আংশিক অধিকার পাবে এবং ইসরায়েল প্রথমে পশ্চিম তীরের জেরিকো এবং এর পর গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এর বদলে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বৈধতা স্বীকার করবে পিএলও। কয়েক দশকের সংঘাতের শেষে এই সমঝোতাকে তখনকার প্রেক্ষাপটে বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ওই চুক্তির তিন দশক পরও অঞ্চলটিতে সংঘাত বিরাজ করছে। পশ্চিম তীরে বেড়েছে অবৈধ বসতি স্থাপন। গত দুই বছরে পশ্চিম তীরে প্রায় প্রতিদিন অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে প্রাণ গেছে বহু ফিলিস্তিনির।

ভারী যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: রয়টার্স ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা উপত্যকায় ২০ লাখের বেশি মানুষের বাস। গাজা থেকে দখলদারি প্রত্যাহার করলেও নানাভাবে ফিলিস্তিনিদের কোণঠাসা করে রেখেছে ইসরায়েল। 

২০০৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে গাজায় ক্ষমতায় আসে হামাস। কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর ২০০৭ সালের জুনে উপত্যকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয় গোষ্ঠীটি। এর জেরে তখন থেকেই অবরোধ জারি করে ইসরায়েল। গাজায় খাবার পানি ও বিদ্যুতের বড় একটা অংশ আসে ইসরায়েল থেকে। গত ১৬ বছর নিত্য প্রয়োজনীয় এই সেবা দুটির সরবরাহ কমিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের ত্রাণ নিয়ে গাড়ি প্রবেশের পথেও প্রায় সময় বাধা দেয় ইসরাইরলি বাহিনী। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের তথ্য অনুসারে, ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার তিনভাগের এক ভাগ খাদ্য সংকটে ভুগছে। আর ১১ লাখ ফিলিস্তিনি রয়েছে চরম খাদ্য সংকটে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ গাজার বাসিন্দা।

অবরুদ্ধ গাজায় রয়েছে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট। জ্বালানি প্রবেশের ওপর ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে খুবই সীমিত পরিমাণে। ২০২৩ সালে গাজায় দিনে ১৩ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে মাত্র সাত ঘণ্টা করে থাকত। ফলে পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থায় গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। পানি শোধনাগারগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ভূমধ্যসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে।

গাজাবাসীর রোগব্যাধির একটি বড় কারণ অনিরাপদ পানি। ইসরায়েলের অবরোধ উপত্যকার চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলেছে। হাসপাতালগুলোতে মৌলিক সরবরাহ, সরঞ্জাম এবং অবকাঠামোর অভাবে গুরুতর অসুস্থদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। 

বড় পরিসরের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের করিডোর ব্যবহার করে ফিলিস্তিনের অন্য অঞ্চলে যাতায়াতে রয়েছে কড়াকড়ি। ইসরায়েলের হাতে প্রতিদিন এসব নিপীড়ন, বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণের স্বীকার হন ফিলিস্তিনিরা। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জেরুসালেমে পবিত্র আল–আকসা মসজিদে ইসরায়েলি সেনাদের অনুপ্রবেশ, তল্লাশি আরও বেড়েছে। প্রায় একই স্থানে টেম্পল মাউন্টে ইহুদি পূণ্যার্থীদের যাওয়া নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়। 

এ ছাড়া ২০০৮ সালের পর থেকে গত শনিবারের আগ পর্যন্ত গাজায় বেশ কয়েকটি বড় পরিসরের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি অফিস, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো। 

হামাসের চলমান হামলা কয়েক দশকের এসব ইসরায়েলি নিপীড়নের জবাব। হামাসের এমন হামলা কোনো সমাধান না হলেও সংকট সমাধানের দাবি হয়তো। 

হামাসের হামলার আরেকটি সাম্প্রতিক পটভূমি হলো সৌদি-ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হতে যাওয়া এই উদ্যোগে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে ডাকা হচ্ছে না। অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের ছাড়াই সংকট সমাধানের একটা ইঙ্গিত আছে চলমান এই পদক্ষেপে। 

তাই এই হামলার আরেকটি বার্তা হলো, সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদেরও যথাযথভাবে স্থান দিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের দাবি, তাদের কথা শুনতে হবে। সংকট সমাধানে নিতে হবে মতামত। 

কিন্তু ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ডস শুরুর পর থেকে ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। তারা ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে অন্য আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছে। 

ফিলিস্তিন সংকটকে সমাধান না করে এ পর্যন্ত ইসরায়েলের সব সরকার ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারও পূর্বসূরীদের পথেই হাঁটছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরায়েল সরকারের এসব অদূরদর্শিতা আজকের আরাজক পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এ অচলাবস্থার একমাত্র সমাধানের পথ সব ধরনের বর্ণবাদী আচরণ, দখলদারি ও অবরোধের অবসান ঘটানো। ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহণ। সর্বোপরি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। এটিই হতে পারে এই দীর্ঘ সংঘাত সমাধানের নির্ভরযোগ্য উপায়।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, রয়টার্স, প্লাস ৯৭২ ম্যাগাজিন, দ্য গার্ডিয়ান

ইরানে আবার হামলা হলে বদলে যেতে পারে পুরো যুদ্ধের হিসাব! কারণ, এবার শুধু পাল্টা হামলার হুমকি নয়—ইরান বলছে, এবার এমন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, যা এখনো প্রকাশ্যেই আনা হয়নি। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের...
কল্পনা করুন—পৃথিবীর প্রতি দুই ব্যারেল তেলের একটি আসছে এমন এক দেশ থেকে, যেখানে হয় যুদ্ধ চলছে, নয়তো আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ। এটাই আজকের বাস্তবতা। টানা যুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা আর...
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পেট্রোলিং পয়েন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না চীন। এমনকি রাজ্যটির নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে চীনা বাহিনীর অবৈধ...
এতদিন ইরানের হুমকির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কেবল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। হরমুজ প্রণালি ঘিরেও তৈরি হয়েছিল নতুন উত্তেজনা। কিন্তু এবার ইরানের এক প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা এমন মন্তব্য করেছেন, যা...
মুম্বাইয়ে একটি অনুষ্ঠানস্থল থেকে গাড়িতে করে বের হওয়ার সময় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে তিন থেকে চার রাউন্ড গুলি। এ ঘটনায় অক্ষত রয়েছেন তিনি। তবে তাঁর গাড়িচালক ও কাছাকাছি...
ভারতের আগরতলা থেকে কলকাতাগামী একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের প্রধান দরজা মাঝ আকাশে আংশিক খুলে যাওয়ায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে। রোববার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। অবতরণের পর...
বর্তমানে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত সচিবালয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৯ সালে নতুন জায়গায় অফিস শুরু হবে।...
এবার অমর একুশের বইমেলা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি থেকে। মাসব্যাপী এ আয়োজন চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বাংলা একাডেমির এক বিজ্ঞপ্তিতে বইমেলার এ সময়সূচি জানানো হয়েছে। রোববার বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক...
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর