ভারতের নির্বাচন

প্রথম ধাপের পর মোদি-শাহ চিন্তিত কেন

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:১৮ পিএম

ভারতের প্রথম পর্বের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। যেভাবে দলে দলে বিপুল সংখ্যায় মানুষ সবকিছুকে উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে গেছেন, তাতে তাঁরা তো দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন। মানুষ নরেন্দ্র মোদি আসলে খুব হিসেবি লোক। প্রতিটি পা ফেলেন গুনে গুনে। সুতরাং তিনি এটা জানেন না বলে দাবি করলে বিশ্বাস করা কঠিন যে, গতবারের (২০১৯) তুলনায় এবারের প্রথম পর্বে প্রায় ৫-৮ শতাংশ ভোট কম পড়েছে। বিজেপির নিজের ঘাঁটিতেও মানুষ তুলনামূলক কম গেছে ভোট কেন্দ্রে। উত্তর-পূর্বের রাজ্য নাগাল্যান্ডের ছয় জেলায় একটিও ভোট পড়েনি। তারপরও অভিনন্দন!

প্রধানমন্ত্রী মোদির সেকেন্ড ইন কমান্ড অমিত শাহর কথাই ধরুন। গতকাল শনিবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই বলে ক্ষমতাসীন মমতা ব্যানার্জি সরকারকে আশ্বস্ত করেছেন যে, রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে ৩০-৩২টা পেলেও তাঁরা রাজ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন না। কেন এই আশ্বাস? ভারতের সংবিধান অনুযায়ী মমতা সরকারের তো ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা। তাহলে না-ভাঙার আশ্বাসের কী প্রয়োজন? অনেকেরই মনে থাকার কথা ২০১৯-এর নির্বাচনে মোদি বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসার পর কংগ্রেস শাসনাধীন দুটি রাজ্য সরকারকে জোর করে ফেলে দিয়েছিলেন আমিত শাহরা। রাজ্য দুটি হলো কর্ণাটক ও মধ্যপ্রদেশ। তাহলে মমতা দিদির প্রতি এত সদয় হওয়ার কারণটা কী?

ভারতের প্রথম পর্বের ভোট অনেক কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ২০০৪ সালের নির্বাচনের ইতিহাস। দুই দফায় টানা ছয় বছর ক্ষমতায় থাকার পর ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ স্লোগান নিয়ে মাঠে নেমে অটলবিহারি বাজপেয়ী সরকারের ভরাডুরি হয়েছিল। আর কংগ্রেসের কাছেও সেই বিজয় ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আর এই অপ্রত্যাশিত ফলের প্রথম ইঙ্গিত এসেছিল ভোটের হার কম হওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথম দফায় ভোট কম হওয়ার মধ্যে কি মোদি-শাহরা কোনো সিঁদুরে মেঘ দেখছেন? সে ক্ষেত্রে ৩৭০-৪০০ পার হওয়া তো দূরস্থান, সরকার গঠন নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে। আর এ ব্যাপারে মমতা ব্যানার্জির দিকে চেয়ে থাকাটা বিজেপির জন্য একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। মমতা এক সময় বিজেপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দিয়েছেন, মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। 

প্রথম দফায় ভোট কম পড়ার পেছনে অনেকেই প্রচণ্ড গরমকে দায়ী করছেন। তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, এর আগেরবারও তো এই সময়ে নির্বাচন হয়েছে। তখনো গরম এমনই ছিল। হয়তো উনিশ-বিশ। ভারতীয় সাংবাদিক রবিশ কুমারের নামের সাথে এখানে অনেকেই পরিচিত। ম্যাগসেসেই পুরস্কার পাওয়া সাংবাদিক। দীর্ঘকাল এনডিটিভিতে সুনামের সাথে সাংবাদিকতা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি আদানির জিম্মায় চলে যাওয়ার পর স্বেচ্ছায় প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেছেন। সমঝোতা করেননি। এরপর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। ২০২২ সালের ৩ জুন খোলা চ্যানেলটি দুই বছর পেরনোর আগেই সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা এক কোটি ছুঁই ছুঁই করছে। 

নির্বাচনী জনসভায় বিজেপি সমর্থকেরা। ছবি: সংগৃহীত গত ২০ এপ্রিল নিজের ভিডিওতে এর ব্যাখ্যা দিলেন রবিশ কুমার। বলছেন, গরমই যদি কারণ হবে তাহলে মণিপুর, নাগাল্যান্ড, উত্তারাখণ্ড, মেঘালয়, মিজোরাম—এসব রাজ্যে ভোট কম পড়ল কেন? আবহাওয়া তো সেখানে মনোরম। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় তীব্র গরমের মধ্যে লোকজন আগের চেয়েও বেশি ভোট দিল কীভাবে? আসলে ভোট কম পড়ার উত্তর এমন সোজাসাপ্টা হয় না। এখানে মূল প্রশ্ন হিসেবে উঠে আসছে, মানুষ কি ভোটে আগ্রহ হারাচ্ছে? কেন? তাঁরা আসলে কাদের সমর্থক? তাহলে কি শুধু বিজেপির সমর্থকেরা দলে দলে ভোট দিয়েছেন, আর বিজেপি-বিরোধীরা বিমুখ, কারণ আবার তো মোদি আসছেনই? না-কি বিষয়টি উল্টো? এর জন্য ৪ জুন পর্যন্ত অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে। তবে এর আগে আরও অনেক ভাষ্যের, চিত্রপট পরিবর্তনের নমুনা দেখতে হতে পারে। 

ভোট কম পড়ার পেছনে মণিপুরে সহিংস পরিবেশ বিরাজ করা, নাগাল্যান্ডে ভোট বয়কটের ডাক যেমন আছে, তেমনি এবার বহু ভোটারের নাম তালিকায় নেই। অথচ তাঁরা বছরের পর বছর ভোট দিয়ে আসছেন। যেসব রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার (অর্থাৎ রাজ্যে ও কেন্দ্রে বিজেপি সরকার) আছে সেখানেই এই অভিযোগ বেশি। ভোটাররা রোদের মধ্যে জেলাপ্রশাসকের অফিস, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে এর সদুত্তর খুঁজেছেন, কিন্তু পাননি। তবে শাসকেরাই ভোট কম পড়ার এই ব্যবস্থা করেছেন? রাজস্থান এবং গুজরাট ও উত্তর প্রদেশের একাংশে রাজপুত সম্প্রদায় বিজেপির ওপর নাখোশ। তারা পঞ্চায়েত বসিয়ে বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর মুসলমান, খ্রিষ্টান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রতি বিরামহীন অবিশ্বাস তো ভারতীয় শাসকদের আছেই। ফলে শাসকের ধর্মই এদের ভোটদান থেকে যথাসম্ভব বিরত রাখা। 

এর মধ্যে একটা মজার খবর আছে। অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া নামে একটি জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এই মুহূর্তে আলোচনায়। জরিপের ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির বেশ সুনাম আছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রদীপ গুপ্ত একজন ভোট বিশেষজ্ঞও বটে। সম্প্রতি প্রদীপ তাঁর এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, ১৩টি রাজ্য বিজেপিকে চিন্তায় রাখবে। সাথে আরও কিছু ছিল। প্রদীপের এই টুইট বেশিক্ষণ জ্বলে থাকতে পারেনি। অভিযোগ আছে, বিজেপির চাপে তিনি টুইট সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। বলা হচ্ছে, ‘এক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ এবার ভোটের আগে জরিপ করেছিল, যা আর আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু বর্তমানে কোনো কিছু ধামাচাপা দেওয়া খুবই কঠিন। ফলে সামাজিক মাধ্যমে ওই জরিপের পূর্ণাঙ্গ ফল ফাঁস হয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এ নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন প্রদীপ নিজে। 

অসমর্থিত এই জরিপে আসলেই কী বলা হয়েছে, দেখা যাক। বলা হচ্ছে, বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট বা কংগ্রেসের ইন্ডিয়া জোট কেউই গরিষ্ঠতা পাবে না। বিজেপি পেতে পারে ২০৮-২১৯টি আসন। তারা প্রায় ৯০-৯৪টি আসন হারাবে। বিজেপির জোট সঙ্গীরা পেতে পারে ৩৫-৩৮টি আসন। অন্যদিকে কংগ্রেস ১১৫-১২৩ এবং এর শরিকেরা ১২০-১২৮টি আসন পেতে পারে। এর বাইরে অন্যান্যরা ৪০-৫৫টি আসন পাবে। অর্থাৎ, দুই জোটের কোনোটিই আড়াই শ আসন ছুঁতে পারবে না। দ্য কুইন্ট নামের একটি ভারতীয় নিউজ পোর্টাল ফ্যাক্ট চেক করে জানাচ্ছে, অক্সিস মাই ইন্ডিয়ার নামে যে জরিপের কথা বলা হচ্ছে, তা একেবারেই ভুয়া। এই দাবির পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, দ্য কুইন্ট ঠিক এনডিটিভির মতো করে ঘুর পথে কিনে নিয়েছেন গুজরাটের এক ধনকুবের।

তারপরও এত বড় মিথ্যা জরিপ কীভাবে এমন প্রচার ও বিশ্বাসযোগ্যতা পেল, সে প্রশ্ন উঠে আসছে। প্রথম সন্দেহ হলো, অ্যাক্সিসের প্রধানকে তাঁর টুইট সরিয়ে নিতে বাধ্য করা। দুই, অ্যাক্সিস অতীতে ৬৯টি নির্বাচনী জরিপ করেছে। এর মধ্যে ৬৪টি বাস্তব ফলের সাথে দারুণভাবে মিলে গেছে। সেই অ্যাক্সিস এবার হঠাৎ চুপ মেরে গেল কেন? নাকি তাদের জরিপ অন্যরকম হওয়ায় আর আলোর মুখ দেখেনি। কারণ গত ১৭ এপ্রিল বা তার আগে প্রকাশিত সব জরিপে বিজেপি জোটকে ৩৩০ থেকে ৩৯৫ আসন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। আর যারা এই জরিপ সারা দিন ধরে প্রকাশ করেছে তারা মোদি সরকারের ধামাধরা বা গোদি মিডিয়া নামেই পরিচিত।

বিজেপির ভয়টা এখানেই। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর একনিষ্ঠ লেফটেন্যান্ট অমিত শাহর। গত এক দশকে বিজেপির মতো দলকে যেভাবে গুজরাটি লবির দাপটে কুক্ষিগত গত ফেলেছেন, তাতে তাঁদের শত্রু এখন ঘরে-বাইরে সর্বত্র।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও...
দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের একার নয়, এটা আমাদেরও উৎসব বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ শনিবার সকালে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির...
রাজবাড়ী জেলা শহরের সজ্জনকান্দা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে মো. পিয়ারুল (৩০) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া জামে মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর