পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চারশ’ ছবিতে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র। পর্দায় কখনও বন্ধু, কখনও বাবা, কখনো-বা গরীব, কখনও জমিদার কিংবা একতারা হাতে শিল্পী—এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রে তাঁকে দেখা গেছে। রোববার (৫ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১০টা ১০ মিনিটে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি।
তবে রূপালী পর্দায় এই অভিনেতার প্রথম অভিনয় ছিল ‘ডাক্তার’ চরিত্রে। নির্মাতা এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি (১৯৭১)’ সিনেমায় এভাবেই হাজির হয়েছিলেন তিনি।
শুরুটা অনেকটা কাকতালীয়! শুটিং দেখতে গিয়ে অভিনয় করতে হয়েছিল প্রবীর মিত্রকে। তখন পুরান ঢাকার ‘লালকুঠি’ কিংবা ‘বিউটি বোর্ডিং’ কেন্দ্রিক তাঁর আড্ডাস্থল। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই মঞ্চনাটকের সঙ্গে জড়িত তিনি, তাই তাঁর বন্ধু সার্কেলের অনেকেই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট।
বছর পাঁচেক আগে এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক এইচ আকবরকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে প্রবীর মিত্র বলেন, ‘‘আমরা একসঙ্গে নাটক করতাম, লালকুঠি কেন্দ্রিক। এইচ আকবর, আমি, এটিএম শামসুজ্জামান—আরও অনেকেই। আকবর সাহেব একদিন বললেন, ‘প্রবীর বাবু, আমি তো ছবি শুরু করেছি, শুটিংয়ে আসেন না কেন! শুটিং দেখতে আসেন?’ আমার আরেক বন্ধু ছিল হুমায়ুন কবির, সে-ও পরিচালক। তার একটা ভেসপা (স্কুটি) ছিল। একদিন বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে আছি, কবিরকে বললাম, ‘আকবর সাহেব তো শুটিংয়ে যেতে বলেন। চলো, দেখে আসি?’’’
সেসময় জলছবি চলচ্চিত্রের শুটিং চলছিল রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে। বন্ধু কবিরকে নিয়ে সেখানে আসেন প্রবীর মিত্র। চায়ের কাপে জমে ওঠে আড্ডা।
এরপরই স্বপ্নের সেই মুহূর্ত। সাক্ষাৎকারে প্রবীর বলেন, ‘‘কিছুক্ষণ পর আকবর সাহেব এসে ঘুরঘুর করছেন, কিছু বলছেন না! হঠাৎ বললেন, ‘প্রবীর বাবু, আমার যে নির্দিষ্ট শিল্পী—তিনি তো আসেন নাই। আপনি এই ডাক্তারের পার্টটা একটু করে দেন।’ আমি বললাম, পারব? বললেন, ‘হ্যাঁ, পারবেন। ব্যাপার না!’’’
যোগ করে তিনি বলেন, ‘সাহসটা পেলাম এই জন্যে যে, হাজার হাজার লোকের সামনে যেহেতু নাটক করতাম, তাই ভয়টা ছিল না আরকী। দৃশ্যটা ছিল আনু ভাইয়ের (অভিনেতা আনোয়ার হোসেন) একটা পা কেটে ফেলতে হবে।’
১৯৬৯ সালে এভাবেই ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন প্রবীর মিত্র। এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭১ সালে। ধীরে ধীরে অভিনয়েই থিতু হন তিনি।
যদিও ছোটবেলায় খেলাধুলার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন প্রবীর মিত্র। অভিনেতা হবেন—এমনটা ভাবেননি তিনি।
প্রবীর মিত্রের ভাষ্য, ‘খেলাধুলা খুব পছন্দ করতাম। অভিনেতা হব—কোনোদিনই ভাবিনি। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ব্যাডমিন্টন নিয়ে সারা বছর। খেলতে খেলতেই জীবনটা পার করে দিব ভেবেছিলাম; কিন্তু হলো না, বাধা হয়ে দাঁড়াল অভিনয়, যেটা আমাকে সাংঘাতিকভাবে টানল। চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে আসল।’
একে একে তিনি অভিনয় করেছেন বহু কালজয়ী সিনেমায়। এর মধ্যে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘চাবুক’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘মধুমিতা’, ‘অশান্ত ঢেউ’, ‘অলংকার’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।


প্রবীর মিত্রের মরদেহ চ্যানেল আই কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে
এফডিসিতে প্রবীর মিত্রকে শ্রদ্ধা, দাফন আজিমপুরে
