সম্প্রতি রাফাহ সীমান্ত খুলে দেওয়ায় ২০টি ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকেছে গাজায়। আর কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন দুই জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। ইসরায়েল যে গাজা ‘অবরুদ্ধ’ করে রেখেছে, তা এখন স্পষ্ট।
পুরোপুরি দখল না করে ‘অবরোধ’ করে রাখার এই পদ্ধতিটি সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন পদ্ধতি। হামলাকারীরা মনে করে, এভাবে সবকিছুর সরবরাহ বন্ধ করে দিলে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখলে শত্রুপক্ষ রোগ, শোক, বঞ্চনা, অর্ধাহারে ও অনাহারে থাকতে থাকতে মনোবল হারিয়ে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হবে।
আগের দিনে হামলাকারীরা শত্রুপক্ষের মানুষদের হত্যা না করে বন্দি, জিম্মি বা কৃতদাস হিসেবে রেখে দিত। এখন এ ধরনের আচরণকে চরমভাবে অগ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। যদিও এখনকার যুদ্ধে বেসামরিক মানুষেরা বেশি ভোগে এবং জীবন নিয়ে তাদের সব সময় পালিয়ে বেড়াতে হয়।
অবরোধ সব সময়ই একটি নৃশংস ও নিষ্ঠুর কৌশল। এই কৌশলের মাধ্যমে নিরস্ত্র মানুষদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঠান্ডা, দুর্দশায় বিপর্যস্ত রাখা হয়। ওষুধ, পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের সরবরাহ বন্ধ রাখার মাধ্যমে ডায়রিয়া, কলেরাসহ নানা রোগে আক্রান্ত করে মানুষদের তিলে তিলে মারার ব্যবস্থা করা হয়।
গাজা প্রায় ১৬ বছর ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরায়েল। তবে সেখানে জীবনধারণের জন্য মৌলিক জিনিসপত্র সরবরাহ করা হতো। কিন্তু গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাজায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় বাইরে থেকে সাহায্যও পৌঁছাতে পারছে না। গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষ খাদ্য সহায়তার আশায় বসে আছে। এর মধ্যে অবিরাম বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
আধুনিক অবরোধগুলোর মধ্যে অন্যতম অবরোধ ছিল ১৯৪৮–৪৯ সালের বার্লিন অবরোধ। এরপর ১৯৯০ দশকের বসনিয়া ও আফগানিস্তান অবরোধ উল্লেখযোগ্য। আফগানিস্তানের অবরোধ যদিও পশ্চিমাদের দৃষ্টি থেকে বেশ দূরে ছিল, সেই তুলনায় বসনিয়ার নৃশংস অবরোধ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সার্ব আগ্রাসীরা প্রায় চার বছর ধরে বসনিয়ার রাজধানীতে বর্বর হামলা চালিয়েছিল। সামরিক সদস্যদের চেয়ে বেসামরিক মানুষ মরেছিল সবচেয়ে বেশি। তবে সেখানে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ খাবার, ওষুধসহ অন্যান্য সাহায্য সামগ্রী পাঠাতে পেরেছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ২০০ ক্যালরির প্রয়োজন। কিন্তু তথ্য উপাত্ত বলছে, সেই সময় বসনিয়ার অবরুদ্ধ বাসিন্দারা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩০০ গ্রাম খাদ্য সহায়তা পেয়েছিল। এটি ক্যালরি হিসেবে অতি নগন্য।
এ ছাড়া রান্না ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য একজন মানুষের গড়ে পাঁচ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে সেখানে দেড় লিটার পানি দিয়েও কোনোমতে জীবনধারণ করা যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বসনিয়ায় প্রচুর নদী ও জলাশয় ছিল বলে তারা সেখান থেকে পানির প্রয়োজন মেটাতে পেরেছিল। কিন্তু গাজার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুধু মরুভূমি। প্রাকৃতিক পানির উৎস নেই বললেই চলে। তাই গাজায় পানির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় একজন মানুষের জন্য প্রতিদিন অন্তত দুই লিটার পানি দরকার। ২০ লাখ মানুষের জন্য প্রতিদিন দরকার চার হাজার টন পানি। একটি সাধারণ ট্রাকে ২০ টন পর্যন্ত পানি বহন করা যায়। সহজ গাণিতিক হিসাব বলে, এই পরিমাণ পানি সরবরাহের জন্য গাজায় প্রতিদিন পানিবাহী ট্রাকের লাইন কমপক্ষে চার কিলোমিটার দীর্ঘ হবে।
অন্যদিকে খাদ্যপণ্য সরবরাহের জন্য দরকার নদী বন্দর। দিনে অন্তত দুটি জাহাজে করে গাজায় খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। সৌভাগ্যক্রমে ফিলিস্তিন–মিসর সীমান্তের ৪০ কিলোমিটার দূরে একটি বন্দর রয়েছে। তবে গাজায় কোনও বিমানবন্দর নেই। ২০২১ সালে বিমান হামলা করে গাজা বিমানবন্দরটি গুড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। এখন গাজার কাছাকাছি মিসরের আল-গোরাহ এবং এল-আরিশ নামে দু্টি বিমানবন্দর রয়েছে।
এ দুটি বিমানবন্দরে কার্গো উড়োজাহাজ নামানো সম্ভব। তবে বসনিয়ান অভিজ্ঞতা বলছে, একটি এয়ার ফ্রেটারে ১১ টন পর্যন্ত খাদ্য বহন করা যায়। সেই হিসেবে গাজার খাদ্য চাহিদা পূরণ করার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩৬০টি উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে হবে। এটি একটি অবাস্তব সম্ভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এসব সমস্যা সত্ত্বেও গাজায় এখন যেকোনো উপায়ে নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ পৌঁছাতে হবে। এটিই এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।