সেই ২৮ আর এই ২৮ অক্টোবর: বিএনপির ভুল যেখানে

প্রতি বছরই ২৮ অক্টোবর আসে। কিন্তু যদি বলা হয় সেই ২৮ অক্টোবর আর এই ২৮ অক্টোবর, তাহলে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ বুঝবে এই দুটি তারিখের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ১৭ বছর। সময়ের যেমন লম্বা পার্থক্য আছে, তেমনি দুটি ২৮ অক্টোবরের ঘটনার মধ্যেও বিস্তর ফারাক। ১৭ বছর আগের সেই দিনটিতে কী হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী ছিল—তা সম্ভবত অনেকেই ভুলে গেছেন। এই ২৮ অক্টোবর বিএনপি যেটা ঘটিয়েছে তাতে এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। বিএনপির নেতা-কর্মীরা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা মনে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু সে দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের সম্যক ধারণা কমই ছিল।

রাজধানীতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমাবেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে বিএনপির হাত থেকে মাঠের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ অল্প অল্প করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। যার চূড়ান্ত রূপ দেখা গিয়েছিল ২৮ অক্টোবর। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যারা ক্ষমতায় ছিল দু বছর। এরপর ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট।

শনিবার বিএনপি নেতা–কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

গত শনিবার (২৮ অক্টোবর) বিএনপি ঘোষিত পূর্বনির্ধারিত মহাসমাবেশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বিশাল হবে বলেই বলে আসছিলেন দলটির শীর্ষ নেতারা। বড় প্রস্তুতিও ছিল দলটির। বিএনপি যেখানে সমাবেশ করতে চেয়েছে, সেখানেই সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। ব্যাপক ধরপাকড় বা সমাবেশে আসতে বাধা দেওয়ার ঘটনাও তেমন ছিল না। আগের দিন থেকে পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক। তাহলে কেন শহরজুড়ে সংঘাতে জড়াল বিএনপি। সমাবেশ বাদ দিয়ে কেন পুলিশের ওপর হামলে পড়ল দলটির নেতা-কর্মীরা।

সংঘাতের সূত্রপাত:

প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক, পুলিশ সদস্য এবং ফুটেজ থেকে দেখা যায়, শনিবার সকাল ১১টার দিকে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী কাকরাইল মোড়ের আশপাশে অবস্থান নিচ্ছিলেন। এর কিছুটা আগে অফিসার্স ক্লাব ও ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলে ঢোকার মোড় পর্যন্ত বলা যায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের দখলে ছিল। সেখান থেকে তিনটি পিকআপে করে আওয়ামী লীগের ৬০-৭০ জন নেতা-কর্মী সম্ভবত বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের দলীয় সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সেখানে বিএনপির কর্মীরা ধাওয়া দেয় পিকআপগুলোকে। নেতা-কর্মীদের ফেলে পিকআপগুলোর দ্রুত চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংখ্যা দেখে পিকআপ থেকে নেমেই দৌড় লাগান আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

বিএনপিও ধাওয়া দেয়। এর মধ্যে কয়েকজনকে পিটিয়ে আহত করে তারা। এটা সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যের ঘটনা। বিএনপি কর্মীরা তিনটি পিকআপ কাকরাইল মোড়ে ভাঙচুর করে। সেখানে দুটি বাসও ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে অল্প কয়েকজন পুলিশ সদস্য বিএনপি নেতা-কর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এতে বিএনপি কর্মীরা উল্টে পুলিশের ওপর চড়াও হন। এর মধ্যে একজন পুলিশ পড়ে গেলে তার ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা এবং বিচারপতিদের বাসভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে হামলা করে একের পর এক গাড়িতে আগুন দিতে থাকলে পুলিশ সক্রিয় হয়। এর আগে সাংবাদিকদের মারধর, দোকানপাট ভাঙচুরও শুরু করেন দলটির নেতা-কর্মীরা। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার আগেই বিএনপির কর্মীদের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

শনিবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বিএনপি নেতা–কর্মীরা। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

এসব এলাকায় হামলা প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের দেখা যায়নি। একপর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা মূলত পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। দায়িত্বপালনরত পুলিশের ওপর লাঠি নিয়ে মারধর শুরু করে। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। গুলিও করে।

বিএনপির ভুল:

নিজ থেকে সংঘাতে জড়িয়ে বিএনপির প্রথম ভুল হলো গত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের হাত থেকে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে না পেরেই ভোটের আগে পুলিশের সঙ্গে এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া। বলা যায়, পুলিশ বা ক্ষমতাসীন দলের কোনো উসকানি ছাড়াই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার খেসারত দিতে হবে দলটির।

আর সবচেয়ে বড় যে ভুলটি বিএনপি করেছে, তা হলো—বোঝার ভুল। ১৭ বছর আগে ওই দিনটি ছিল ক্ষমতাসীন বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের শেষ দিন। পরদিনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। সেদিন তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল; অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলগুলো মূলত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিল। যারা সে দিনের ঘটনা সম্পর্কে জানেন তাঁদের মনে থাকার কথা, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যখন সংঘাত শুরু হয় সে সময়ে পুলিশ-প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল হয়ে গিয়েছিল।

বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাঁরা আমেরিকা ও তাদের ভিসা নীতির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকবে, সরকার ভয় পেয়ে সরে থাকবে—এমন একটা ধারণা তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। যদি ধরে নিই বিএনপি নেতাদের এমন যুক্তি বা ধারণা ঠিক, তাহলেও সংঘাতে জড়ানো ঠিক হয়নি। কেননা আমেরিকার ভিসা নীতি তো সরকার বা বিরোধী—সব রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রযোজ্য।

রোববার কুমিল্লায় বিএনপি নেতা–কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

মহাসমাবেশের নামে এই সহিংসতার মাশুল বিএনপিকে ভবিষ্যতে দিতে হবে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর আন্দোলনে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা হয়তো সময় বলে দেবে। তবে কেবল হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচি দিয়ে সরকার পতন ঘটানো যায় না—তা ২০১৪ ও ২০১৫ সালে তাদের টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি প্রমাণ করেছে। অনেকেই বলেন হরতাল এখন আর জোরালো কোনো কর্মসূচি না। হরতালে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিও থাকে না। টানা হরতাল এক সময় ফিকে হয়ে আসে।

২০১৫ সালে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দেয় বিএনপি। যা আর প্রত্যাহার করা হয়নি। কিন্তু ৯৩ দিন চলার পর ওই কর্মসূচি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। রাজপথে না থেকে ঘরে বসে ডাকা হরতাল-অবরোধ শেষ পর্যন্ত কতদিন কার্যকর থাকবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।