কী-ই বা এমন চেয়ে ফেলেছিলেন উসমান খাজা? একভাবে দেখলে তো নির্দোষ একটা চাওয়া!
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে নির্বিচারে প্রাণ যাচ্ছে নিষ্পাপ অনেক শিশুর, তা দেখে মন কাঁদে খাজার। গাজার শিশুদের জায়গায় অজান্তে কল্পনায় নিজের দুই মেয়ের মুখ ভেসে ওঠে পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত অস্ট্রেলিয়ান ওপেনারের, গা কেঁপে ওঠে তাঁর। তাই শুধু গাজায় শিশুদের এভাবে নির্বিচার হত্যার প্রতিবাদে প্রথমে ছোট্ট দুটি বাক্যে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিলেন খাজা।
পাকিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার চলমান তিন টেস্টের সিরিজের প্রথমটির আগে অনুশীলনে বার্তা দুটি লেখা জুতো পরে নেমেছিলেন খাজা, সে ছবি ছড়িয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমের সৌজন্যে। ওই জুতো পরেই পার্থে প্রথম টেস্টে নামার পরিকল্পনা ছিল খাজার। কিন্তু আইসিসি বাধ সাধে।
কারণ? বার্তা দুটি নিষ্পাপ হলেও এতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে একটা পক্ষ নিয়ে নেওয়া হয়। যুদ্ধ মানেই তো সেটির উৎসে রাজনীতির কূটকৌশল, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দখলদারিত্বের লোভ। ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে দুই দেশের সিংহভাগ মানুষের ধর্মপরিচয়ের কারণে এই যুদ্ধ মানে ‘ইহুদি বনাম মুসলিমের’ ধর্মযুদ্ধ। আর আইসিসির আইন এ ব্যাপারে কড়া—কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বা বর্ণবাদবিদ্বেষী বার্তা খেলোয়াড়দের জার্সি বা সরঞ্জামে থাকা যাবে না।
খাজার দৃষ্টিতে তাঁর বার্তাটি মানবিক, আইসিসির দৃষ্টিতে রাজনৈতিক। অগত্যা আইসিসির আইন মেনে নিলেন খাজা, পার্থ টেস্টে আর ওই জুতো পরে নামেননি। যদিও বার্তাটিতে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না, সেটি শুধুই এক মানবিক আবেদন ছিল জানিয়ে টেস্টের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওবার্তায় ঘোষণার সুরে খাজা বললেন, আইসিসির সঙ্গে এ নিয়ে তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।
খাজার লড়াই চলছে। একের পর এক পরিকল্পনা নিয়ে আসছেন গাজার পাশে দাঁড়ানোর। আইসিসিও বারেবারে নিষেধ করেই চলেছে, যার সর্বশেষটি এল গতকাল—মেলবোর্নে আজ শুরু হওয়া পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়ার বক্সিং ডে টেস্টের আগের দিন।
এতে আলোচনা হচ্ছে। বিতর্ক জমছে। বেশির ভাগের চোখে আইসিসি একটা ‘মানবিক’ ব্যাপারে এভাবে কঠোর না হলেও পারে। গুটিকয়েকের চোখে খাজাই বাড়াবাড়ি করছেন। কিন্তু এতে কি গাজাবাসীর কোনো লাভ হচ্ছে?
দৃশ্যত, উত্তর— না। আসলেই কি তা-ই?
বিশ্লেষণের আগে পূর্বাপর জেনে নেওয়া যাক। খাজা কী কী করেছেন? পার্থ টেস্টের আগে জুতোয় ওই দুটি বার্তার কথা তো লেখা হলো, আইসিসির নিষেধের পর পার্থে তিনি নেমেছেন বাহুতে কালো বন্ধনী পরে। সবার ধারণা জন্মাল, ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াতেই খাজার এ কালো বাহুবন্ধনী। আইসিসি আবার সরব। জানিয়ে দিল, খাজা আইন ভেঙেছেন। অস্ট্রেলিয়ার ওপেনারের বিরুদ্ধে তাই চার্জ আনে ক্রিকেটের বৈশ্বিক সংস্থা।
খাজা জবাবে জানালেন, এ কালো বাহুবন্ধনী ফিলিস্তিনের জন্য নয়, তাঁর ব্যক্তিগত একটা শোকের কারণে। আইসিসিকে এটা আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিলেন বলেও দাবি তাঁর। এ নিয়ে রায় এখনো আসেনি।
এরপর মেলবোর্নে পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্টের আগে অনুশীলনে খাজার জুতো আর ব্যাট আবার আলোচনায়। কারণ? জুতো আর ব্যাটে কালো রঙে পায়রার একটা ছবি এঁকে নিয়েছেন খাজা। এবারও পরিকল্পনা ছিল, টেস্টে এ নিয়েই নামবেন তিনি। এবং ‘যথারীতি’ আইসিসির দিক থেকে জানিয়ে দেওয়া হলো, এটা নিয়ে নামা যাবে না।
বিতর্ক তুঙ্গ স্পর্শ করল! দুই দিকের যুক্তি কী? খাজার পক্ষে যুক্তি—পায়রা তো শান্তির প্রতীক, শান্তি চাওয়ায় দোষের কী আছে! আইসিসির যুক্তি, পায়রা প্রতীকের পেছনের উদ্দেশ্য তো সেই একই—ফিলিস্তিন আর ইসরায়েল যুদ্ধে কোনো একটা পক্ষ নিয়ে নেওয়া!
কিন্তু খাজা এমন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে আইসিসির আচরণের পার্থক্য নজরে আনছেন। গতকাল ইনস্টাগ্রামে বড়দিনের শুভেচ্ছা জানানো ভিডিওবার্তায় আইসিসিকে খোঁচা মারলেন লাবুশেনসহ আরও দুজনের উদাহরণ টেনে, আইসিসির ‘দ্বিচারিতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়ে।
ভিডিওতে প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিকোলাস পুরানের একটা ছবি আছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, তাঁর ব্যাটে যিশু খ্রিস্টকে বিদ্ধ করা ক্রুশের ছবি। আইসিসি তাতে নিষেধ করেনি। পরের ছবিটি লাবুশেনের ‘ঈগল’-এর। এরপর ছবি এই বিশ্বকাপেই দক্ষিণ আফ্রিকার কেশব মহারাজের ব্যাটের, যেখানে হিন্দু ধর্মীয় বিশেষ চিহ্ন ‘ওঁ’ আঁকা।
খাজার অভিযোগ, আইসিসি ওই তিন চিহ্নের বেলায় কোনো মানা করেনি, তাঁর শান্তির প্রতীকের বেলায়ই কেবল করছে। ইনস্টাগ্রাম পোস্টের ক্যাপশনে তাই খাজার হ্যাশট্যাগ, ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড!’
আইসিসি এই প্রতিবেদন লেখার সময়েও এসবের ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে একটু ভাবলে একটা ব্যাখ্যা অনুমান করে নেওয়া যায়। লাবুশেন, মহারাজ বা পুরান—তিনজনের ক্ষেত্রেই চিহ্নটি ছিল তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতীক। খাজার পায়রার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়, এটি ঘুরেফিরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। আর ক্রিকেট মাঠকে আইসিসি দৃশ্যত যুদ্ধের আওতার বাইরেই রাখতে চায়। দুর্ভাগ্যবশত, তাই খাজার আবেদনে আইসিসির ইতিবাচক সাড়া আসছে না।
কিন্তু যেকোনো বিতর্কের মতো এরপরও পাল্টা যুক্তি আসে। এখানে তা আসছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি মাইকেল হোল্ডিংয়ের দিক থেকে। খাজার বেলায় আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ আনছেন হোল্ডিংও। তাঁর যুক্তি, খাজার শান্তির আহ্বানে আইসিসি মানা করছে, তাহলে এর আগে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর বেলায় হাঁটু গেঁড়ে বসার নিয়মে কেন সম্মতি দিয়েছে? কিংবা সমকামীদের আন্দোলনে কেন স্টাম্পকে রঙধনুতে রাঙিয়েছে?
কিন্তু এই ডামাডোলে ফিলিস্তিনের কী লাভ হচ্ছে? তাঁদের পাশে খাজার দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই না এই 'আন্দোলনে'র শুরু হলো!
এ ক্ষেত্রে আইসিসির কারণে হয়তো একটা লাভই বরং হচ্ছে ফিলিস্তিন আর গাজার মানুষের। আইসিসির তাতে ঐচ্ছিক কোনো ভূমিকা নেই বটে। বোমা-গুলির হাত থেকে বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যে এই লাভ কতটা গাজাবাসী অনুভব করছেন, সে-ও এক প্রশ্ন।
তা লাভটা কী?
ব্যাখ্যায় একটু পেছনে ফিরতে হবে। ধরুন, খাজা যখন দুটি বার্তা লেখা জুতো পরে নামতে চেয়েছিলেন, আইসিসি অনুমতি দিয়ে দিল। কী হতো তখন? বড়জোর টিভিপর্দায় বার দুয়েক পাঁচ-দশ সেকেন্ডের ফুটেজ পেত খাজার জুতো। বার্তা দুটি দেখা যেত, সেটাও যদি ক্যামেরা জুম করে তা দেখাত আর কী! ‘গাজার পাশে দাঁড়ালেন খাজা’ জাতীয় শিরোনামে দু-চারটি সংবাদমাধ্যমে খবর হতো।
কিন্তু নিয়মের বেড়াজালের কারণে হলেও আইসিসি খাজাকে নিষেধ করার পর থেকে বারেবারে এসব আলোচনায় আসছে। খাজা কী বললেন, নতুন করে কী করলেন, আইসিসি কী বলল, খাজা-আইসিসির বিতর্কে কে কী বললেন…সবই খবরের শিরোনামে।
এই যেমন, আজকের তাজা খবর—মেলবোর্ন টেস্টের প্রথম দিনে খাজা নেমেছেন দুই জুতোয় তাঁর দুই মেয়ের নাম লিখে নিয়ে। 'আইশা', 'আইলা' - এখানে আইসিসির কিছু বলার থাকতে পারে না। কিন্তু গত কদিনে এ খাজা-গাজা-আইসিসি সংক্রান্ত খবরের পূর্বাপর জানা থাকলে যে কারওই বোঝার কথা, তাঁর দুই মেয়ের মাঝে ফিলিস্তিনে নিহত শিশুদেরই দেখেন খাজা। দুই মেয়ের নাম লিখে নামাও তাই গাজার শিশুদের জন্যই।
খাজার এসব কর্মকাণ্ডের লাভ ওখানেই। যতবার খাজার সব খবর আলোচনায় আসছে, ততবার ঘুরেফিরে হৃদয় নাড়িয়ে যায় ফিলিস্তিন। খাজা যখন বলেন, গাজার নিহত শিশুদের জায়গায় নিজের দুই মেয়েকে কল্পনা করলে তাঁর গা শিউরে ওঠে, দীর্ঘশ্বাস ঝরে গাজার শিশুদের জন্য। খাজা যখন মনে করিয়ে দেন, জন্মস্থান কেউ নির্ধারণ করে নিতে পারে না, ফিলিস্তিনের শিশুদের দুর্ভাগ্য তখন হয়তো হৃদয়ে দুঃখবোধ জাগিয়ে যায়।
তাতে ফিলিস্তিনের শিশুদের কোনো লাভ কি হচ্ছে? বোমাবর্ষণ বন্ধ হচ্ছে? ক্ষণস্থায়ী লাভের চিন্তা করলে, উত্তর—না!
মানবিক আবেদনের আওয়াজ যুদ্ধের বোমা-গুলির শব্দকে ছাপিয়ে যায় না। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার খেলায় যে যুদ্ধের জন্ম, সেখানে মানবিক আবেদনের গুরুত্ব আর কতটুকু। গুরুত্ব থাকলে তো যুদ্ধ হতোই না!
লাভ শুধু এতটুকুই, এ আবেদনগুলোর আওয়াজ যত বাড়ে, ধীরে হলেও একটা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়। যুদ্ধবিরতির মতো প্রস্তাবে ভার বাড়ে। তাতে ফিলিস্তিনের শিশুদের নির্বিচার হত্যা বন্ধের সম্ভাবনা যদি তৈরি হয় আর কী!
গাজার নিষ্পাপ শিশুদের নিঃশব্দ কণ্ঠগুলোর আওয়াজ যদি খাজার আবেদনে বিশ্বে ছড়িয়ে যায় আর কী!