ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যার অভিযোগ এনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা দায়ের করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। গাজায় তিন মাস ধরে চালানো ধ্বংসযজ্ঞ ও বোমা হামলায় ২২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় গত মাসের শেষদিকে এমন অভিযোগে দেশটি এই মামলা করে।
এবার শুরু হচ্ছে এই মামলার শুনানি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার আদালতে প্রথমবার এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই প্রথম এমন অপরাধে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে ‘কাঠগড়ায়’ দাঁড়াতে হচ্ছে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে। এই ইহুদিদের ওপরই একসময় চালানো হয় গণহত্যা। নামটি কখনও ভুলার নয়, হলোকাস্ট। তেমনই গণহত্যার অভিযোগ এবার তাদের বিরুদ্ধে।
গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যাসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলা হয়েছে বলে মামলার আবেদনে বলা হয়। তবে জাতিসংঘের আদালতে মামলাটি প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলছেন, ‘এই অভিযোগ মিথ্যা’।
মামলায় যা বলছে দক্ষিণ আফ্রিকা
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলার ৮৪ পৃষ্ঠার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলের কার্যকলাপ এক ধরনের গণহত্যা। কারণ, তারা গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশকে ধ্বংস করে দিতেই এই কাজ করছে। ইসরায়েলের গণহত্যামূলক কার্যকলাপের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের হত্যা, গুরুতর মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে সমগ্রভাবে ওই গোষ্ঠীর শারীরিক ক্ষতি হয়।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার আইন বিভাগের অধ্যাপক জুলিয়েট ম্যাকিনটায়ার বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার এই মামলায় সবকিছু সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে। মনে হচ্ছে, সবকিছু নিয়েই মাঠে নেমেছে তারা।
আন্তর্জাতিক আদালতের কাজটা কী?
বিবিসি বলছে, আইসিজে হলো জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সমস্যার সমাধান করে। জাতিসংঘের সব সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইসিজেরও সদস্য। কোনো রাষ্ট্র মামলা দায়ের করতে চাইলে, তাকে আইসিজের দ্বারস্থ হতে হবে। আইসিজেতে ১৫ জন বিচারক রয়েছেন, যাদের নয় বছরের জন্য নির্বাচন করে সাধারণ পরিষদ ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।
জেনোসাইড কনভেনশন বিরোধী মামলাগুলোর শুনানি হয় আইসিজেতে। ১৯৪৫ সালে এই আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ব আদালত নামে এই আদালতের কার্যক্রম চলে নেদারল্যান্ডসের হেগে।
গণহত্যার মামলায় ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকা মোট ১৭ জন বিশেষ বিচারক নিয়োজিত করেছেন। এই মামলার কার্যক্রম দীর্ঘদিন চলবে বলেই মনে করছের বিশ্লেষকেরা। সেক্ষেত্রে মামলার দিকে তাকিয়ে থেকে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আশা হয়ত করা যাবে না। তবে আশা একেবারে নেইও বলা যাবে না।
ইসরায়েল কী বলছে
এই মামলাকে মানহানিকর বলে অভিহিত করেছে ইসরায়েল। উল্টো হামাসকে গণহত্যার জন্য দায়ী করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ সবচেয়ে নৈতিকভাবেই কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমার জিজ্ঞাসা হচ্ছে, এতদিন কোথায় ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা? যখন সিরিয়া, ইয়েমেন ও অন্যান্য এলাকায় লাখো মানুষ মারা গেছে, তখন তারা কোথায় ছিল?’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, এরপরও আদালতে হাজির হতে হবে ইসরায়েলকে। নিজেদের মধ্যে দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের কারণে এমন হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে ইসরায়েলিরা এই যুদ্ধে সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, জরিপ সে কথাই বলছে।
আদালত যুদ্ধ বন্ধ করতে বললে যা হবে
লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক বিচার বিশেষজ্ঞ দানিয়েল ম্যাকোভার সিএনএনকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে এসব মামলার কার্যক্রম চলে দীর্ঘদিন। তবে এই মামলার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগে প্রাথমিক একটি আদেশ আসতে পারে। সেটি কবে নাগাদ আসবে, তা বলা মুশকিল। মামলার কার্যক্রম দেখে বোঝা যাবে।
আমেরিকার মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ফ্রান্সিস বয়েলের কণ্ঠেও একই কথা। তিনিও মনে করেন, চূড়ান্ত রায় আসার আগে গাজায় হামলা বন্ধ করা বা অন্য কোনো আদেশ আসতে পারে আদালত থেকে। এর আগে যুগোশ্লাভিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে তিনি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পক্ষে লড়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এ কথা বলছেন।
ফ্রান্সিস বয়েল বলেন, বৃহস্পতিবার শুনানি শুরু হবে। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোনো কোনো আদেশ আসতে পারে। এ নিয়ে ইসরায়েলের কোনোকিছু বলার না থাকলেও তারা আদালত ও এর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার পাশে আছে যারা
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করা গণহত্যার মামলায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে অনেকেই সমর্থন দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের জোট ওআইসি। ৫৭ সদস্য রাষ্ট্রের এই জোটে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান পাকিস্তান ও মরক্কোর মতো দেশ।
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি এই মামলায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে সমর্থন দিয়েছে মালয়েশিয়া। এরপর একে একে তুরস্ক, জর্ডান, বলিভিয়াও সমর্থন দিয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন দেশের নেতারাও দক্ষিণ আফ্রিকাকে সমর্থন দিচ্ছে।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ তিন মাস পেরিয়ে গেছে। হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছরের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ২২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া গাজায় বসবাসকারী ২৩ লাখ মানুষের বেশিরভাগই বাস্তুচ্যুত।
ইসরায়েল দাবি করেছে, গত ৭ অক্টোবর হামাসের সন্ত্রাসীরা দক্ষিণ ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা চালিয়ে ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া ২৪০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে উভয় পক্ষের সম্মতিতে যুদ্ধবিরতির সময় কিছু জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হলেও এখনো ১২০ জন জিম্মি হামাসের হাতে বন্দী।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি আবারও হামাসকে নির্মূল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘গাজায় সম্পূর্ণ বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সবকিছু এক পাশে রেখে দিতে হবে। হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল না করা পর্যন্ত, আমাদের জিম্মিদের ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত এবং গাজা আর ইসরায়েলিদের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না—তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।’