যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভরাডুবি হলো ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির। এর ফলে ১৪ বছর পর ক্ষমতা হারাল ঋষি সুনাকের দল। লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে পরাজয় মেনে নিয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ঋষি। হারের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। প্রশ্ন হলো, এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর কেন এমন ভরাডুবি কনজারভেটিভ পার্টির?
২০১০ সালে নির্বাচনে জয়ের পর কনজারভেটিভ ও দ্য সেন্ট্রিস্ট লিবারেল ডেমোক্র্যাটসরা মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। তখন প্রধানমন্ত্রী হন ডেভিড ক্যামেরন। বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের পর ক্ষমতায় আসেন ক্যামেরন। ক্ষমতায় এসেই তিনি বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর আমলে জনসাধারণের ব্যয় জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নেমে আসে।
২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় আসেন ক্যামেরন। এরপরের বছর ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান ক্যামেরন। এই কনজারভেটিভ নেতা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাজ্যের যুক্ত থাকার পক্ষে ছিলেন।
ক্যামেরনের পর যুক্তরাজ্যের গদিতে বসেন থেরেসা মে। যুক্তরাজ্য কীভাবে ইইউ ছেড়ে যাবে সে বিষয়ে হওয়া চুক্তি চূড়ান্ত করতে প্রয়োজনীয় আইনের সংসদীয় অনুমোদন পেতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। পরে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন মে। এরপর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন বরিস জনসন। ব্রেক্সিট করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই বছরের জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় জনসনের দল কনজারভেটিভ পার্টি।
জনসনের তিন বছরের শাসনামল বিতর্ক এবং দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ছিল। করোনাকালে বিধি ভেঙে জনসন আনন্দ উৎসব করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন জনসন।
জনসনের পরে ৪৯ দিনের জন্য যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। এটি ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রধানমন্ত্রী স্থায়ীত্বকাল। যুক্তরাজ্যে যখন জিনিসপত্রের দাম এবং জ্বালানির খরচ বাড়তে থাকে তখন আনা বিপর্যয়কর কর পরিকল্পনা আনেন।
তাঁর কর কমানোর পরিকল্পনায় বিশ্বব্যাপী বন্ড বাজারে কয়েক সপ্তাহ অস্থিরতা চলে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রকাশ্যে যুক্তরাজ্য সরকারকে তিরস্কার করে। এই সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেন ট্রাস। এরপর কনজারভেটিভ পার্টি ভরসা করে ভারতীয় বংশোদ্ভুত এবং যুক্তরাজ্যের সে সময়ের অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাকের ওপর। মাত্র ৪২ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন সুনাক। আধুনিক ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঋষির বয়স সবচেয়ে কম।
ক্ষমতায় এসেই নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে যুক্তরাজ্যের অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা করেন ঋষি সুনাক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবর্তন আনেন অভিবাসন নীতিতে। কিন্তু ১৪ বছরের অনিয়মের প্রভাব কাটিয়ে জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হন। এক পর্যায়ে গত ২২ মে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন সুনাক।
৪ জুলাই নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন জরিপে কনজারভেটিভ পার্টির ভরাডুবির আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। চূড়ান্ত ফলে যা সত্য প্রমাণিত হয়।
এবারের নির্বাচনে গতবারের তুলনায় আড়াই শ আসন হারিয়েছে সুনাকের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টি। যুক্তরাজ্যের জনগণ যথাযথ রায় দিয়েছে উল্লেখ করে পরাজয় মেনে নিয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ঋষি সুনাক। দুঃখ প্রকাশ করে হারের দায় তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে।
কনজারভেটিভ সরকারের ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে গবেষণাপত্র 'দ্য কনজারভেটিভ ইফেক্ট'-এর সহ-লেখক টম এগারটন এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ‘গত চার বছর এই পার্টি বিশেষ করে লিজ ট্রাসের মতো লোকেরা তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। জনসাধারণের চোখে আমরা সবাই জানি যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্বাচনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারি, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
স্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রিটেনেস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ (এনআইইএসআর) জানায়, ইইউর সঙ্গে থাকলে এখন ইউকের জিডিপি ২ থেকে ৩ শতাংশ বেশি থাকত।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কর্মক্ষমতা নিয়ে ভোটাররা অসন্তুষ্ট ছিল। দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন চিকিৎসা সেবার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
২০২১ সালের জুলাইয়ের পর দেশটিতে খাদ্যের দামও ২০ শতাংশ বেড়েছে। ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন ইস্যুতেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ঋষি। তিনি অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার জন্য অবৈধ অভিবাসনের ইস্যুতে সোচ্চার হন। অভিবাসীদের রুয়ান্ডায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচিত হন তিনি। এসবের মধ্যে সুনাক মে মাসের শেষের দিকে সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেন। এরপরই সুনাকের ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা বাড়তে থাকে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, এনবিসি ও আটলান্টিক