কম্পিউটার পেরেছে, এআই কি পারবে?

বিশ্বজুড়ে চ্যাটজিপিটির আনুষ্ঠানিক আগমনের প্রায় ২ বছর হতে চলল। মূলত এর মাধ্যমেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় প্রবেশ করে বিশ্ববাসী। ১৯৮০‑এর দশকে এমনই একটি নতুন যুগের সূচনা দেখেছিল সারা পৃথিবীর মানুষ। সেটি হলো কম্পিউটারের গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেসের সূচনা। বিল গেটস নিয়ে এসেছিলেন তা। আর এর পরের এক দশকে পুরো কম্পিউটার জগতই স্রেফ উল্টে‑পাল্টে গিয়েছিল। কিন্তু এআই‑এর আগমনে কথা যত হচ্ছে, কাজে তার প্রয়োগ কি ততটা হচ্ছে? এআই নিয়ে যত সম্ভাবনা বা আশঙ্কার রব উঠছে, আসলেই কি সেই পরিবর্তন হচ্ছে? কম্পিউটারের মতো এআই কি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারবে? 

চ্যাটজিপিটির আবির্ভাবের পর থেকেই বলা হচ্ছে যে, জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খুব দ্রুত গতিতে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থায় পরিবর্তন আনবে। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো নিয়েও এন্তার আলোচনা হচ্ছে। যেমন, তাইওয়ানের ন্যাশনাল তাইপেই ইউনিভার্সিটির করা এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি অভূতপূর্ব মাত্রায় বাড়তে পারে। অন্যদিকে বিখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের করা ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআই বৈশ্বিক জিডিপি বাড়াতে পারে, এমনকি শ্রম উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিও বাড়িয়ে দেবে। আর উৎপাদনশীলতা গড়ে বাড়তে পারে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের গত ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বের শ্রমবাজারের প্রায় ৪০ শতাংশে সরাসরি প্রভাব ফেলবে এআই। তার অর্থ হলো, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি এক অর্থে ব্যাপকভাবে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এত কিছুর পরও বর্তমানের অর্থনীতিতে এআই‑এর প্রভাব বেশ সীমিত মাত্রার। এমনকি প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে থাকা আমেরিকাতেই এখনও পর্যন্ত এআই ব্যবহার করা ব্যবসায়িক উদ্যোগের পরিমাণ মোটের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ। এই হিসাব আমেরিকার সেনসাস ব্যুরোর। এবার তাহলে বুঝে দেখুন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যবসা‑বাণিজ্যে এআই ব্যবহারের হার কতটা কম! নিজের আশপাশের চাকরি বা ব্যবসার ক্ষেত্রে চোখ বোলালেও এটি বোঝা যাবে বেশ।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে ওপেনএআই নিয়ে আসে চ্যাটজিপিটি নামের এআই চ্যাটবট। ছবিসূত্র: রয়টার্সএমন নয় যে, নানা ধরনের এআই টুলস আসছে না! আসছে। তবে তারপরও এসবের প্রায়োগিক ব্যবহারের হার অত্যন্ত কম। কিন্তু কেন এআই প্রবল গতিতে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হচ্ছে? এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা গত শতকের কম্পিউটারের যুগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন। তাঁদের মতে, কম্পিউটার যুগের শুরুতেও এই এআই‑এর মতো করে খুব দ্রুত সব উল্টেপাল্টে যাবে বলা পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তনের শুরুটা হতে প্রায় ১ দশকেরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়েছিল। মূলত ১৯৯০‑এর দশকে কম্পিউটার দুনিয়ার অর্থনৈতিক রূপান্তর শুরু হয়েছিল। এবং এর পর আগের তুলনায় দ্রুত গতিতে কম্পিউটারের জয়যাত্রা এগোতে থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও এমনটাই হতে পারে। 

বর্তমান পরিস্থিতি বোঝাতে কম্পিউটার যুগের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে মোট তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, কম্পিউটার যুগের মতো উৎপাদন খাতে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন দেখতে হলে তিনটি ঘটনা ঘটতে হবে। প্রথমত, কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তির এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজারে এআই‑সংক্রান্ত প্রযুক্তির দাম কমতে হবে ধারাবাহিকভাবে। এবং তৃতীয়ত, বিভিন্ন খাতের পরিচালন ব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহারের নিত্যনতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তিনটি ঘটনাই কম্পিউটার যুগের শুরুর দিকে সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম বিষয়টির ক্ষেত্রে কম্পিউটার যুগের তুলনা করলে কী দেখা যায়? এক্ষেত্রে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৮০‑এর দশকে কম্পিউটারের গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেসের সূচনা হলেও, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ও সফটওয়্যার খাতে বিনিয়োগ বাড়ে মূলত ১৯৯৫ সাল থেকে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে এই খাতে বছরে ব্যয় বাড়ে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি। এর উল্টো পিঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে এখনও বিনিয়োগের পরিমাণ আশানুরূপ নয়। গত ২ বছর ধরে এ‑সংক্রান্ত উপকরণ ও সফটওয়্যার খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে বছরে মাত্র ৪ শতাংশ হারে। এখনও এআই টুলস খাতে বিভিন্ন কোম্পানি ব্যয় করছে অনেক কম। এবং এর পরিমাণ কম্পিউটার যুগের তুলনায়ও কয়েক গুণ কম।

দ্বিতীয় বিষয়টিতে এবার নজর দেওয়া যাক। ১৯৯০‑এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের বাজারমূল্য খুচরা পর্যায়েও দারুণভাবে কমে গিয়েছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে এই দাম কমেছিল প্রায় এক‑তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। এবং সেই সঙ্গে মানসম্পন্ন ও দামে সস্তা কম্পিউটারে বাজার ছেয়ে গিয়েছিল। ফলে কম্পিউটারের ব্যবহারও বেড়ে গিয়েছিল। এতে দিনশেষে লাভ হয়েছিল কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যেরই। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি এখনও সেই পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। দামে সস্তা হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো গত বছরের শেষ প্রান্তিকে এআই‑সংক্রান্ত পণ্যগুলোর দাম বছরে প্রায় ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। অথচ এই খাতে যে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কাজ করে, তাতে ব্যয় যে খুব বেশি, তা কিন্তু নয়। আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে কিছু মধ্যস্বত্বভোগীর জন্য এবং এই সমস্যাটি সমাধানে এখনও বাজার নিয়ন্ত্রকেরা খুব বেশি সচেষ্ট হচ্ছে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটছে না।

তৃতীয় বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য যেভাবে বিভিন্ন খাতের উৎপাদন ও পরিচালন প্রক্রিয়ার রূপান্তর ঘটানো হয়েছিল, সেটি এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। ফলে এর ব্যবহারের চাহিদাই তৈরি হচ্ছে না। আর চাহিদা না থাকলে, ব্যবসা বাড়বে কীভাবে! তাই বিশ্লেষকদের মতে, এআই‑এর সম্পূর্ণ সক্ষমতাকে উৎপাদন খাতে কাজে লাগাতে হলে আরও অনেক মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। নইলে আশা নেই।

এ বিষয়ে গুগলে কর্মরত অর্থনীতিবিদ ফ্যাবিও কুর্তো‑মিলে মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজাত অর্থনৈতিক প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করছে এটি বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কী পরিমাণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে, তার ওপর। পুরো বিশ্বে এমন অনেক বাজার আছে, যেখানে সঠিক সেবাভিত্তিক পণ্যের অভাব আছে। এখন সেসব অভাব যদি পূরণ করতে পারে এআই, তবেই এটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারবে। এবং এর ওপরই মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ভর করছে। 

অর্থনীতিবিদ হিসেবে ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময়টাই বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে কাটিয়েছেন রুডি ডর্নবুশ। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মানুষ যেভাবে ভাবে, অর্থনীতিতে সেই একই রূপান্তর প্রক্রিয়ার গতি অনেক সময় ধীর থাকে। অর্থাৎ, মানুষ ভাবে যে, এই বুঝি সব পাল্টে গেল চোখের পলকে! কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা হয়তো ধীরে ধীরে ঘটে। আবার যখন রূপান্তর বা পরিবর্তন শুরু হয় ঠিকমতো, তখন দেখা যায়, মানুষ সর্বোচ্চ যে গতির কথা ভেবেছিল, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে সব বদলে যাচ্ছে! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও এমনটাই হবে বলে ধারণা রুডির। 

এই ক্ষেত্রেও কম্পিউটার যুগকেই মডেল মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, এখনকার যে কম্পিউটার আমরা দেখি ও ব্যবহার করি, তার নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল ১৯৭০‑এর দশকে মেমোরি চিপ ও সিলিকন মাইক্রোপ্রসেসর আবিষ্কারের মাধ্যমে। অথচ এর ২০ বছর পরও সারা বিশ্বের মোট বাণিজ্য খাতের ১০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করত কম্পিউটার। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্য ই‑মেইল, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের আবির্ভাবের সূত্র ধরে পুরো পৃথিবীতে সাম্রাজ্য বিস্তার করে কম্পিউটার। তা এমন মাত্রাতেই যে, এখন কম্পিউটার ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই কল্পনা করা যায় না।  

হালের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও যে সেই পথই অনুসরণ করবে না, তা কে বলতে পারে!

তথ্যসূত্র: সায়েন্স ডাইরেক্ট, গোল্ডম্যান স্যাকস ডট কম, আইএমএফ ডট ওআরজি, দ্য ইকোনমিস্ট, উই ফোরাম ডট ওআরজি, এমআইটি নিউজ, আইডিসি ডট কম ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট