বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের প্রবেশমুখেই অবস্থিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। গত কয়েক দশক ধরে এলাকাটি নিয়ে নানা রহস্য ও ভীতি কাজ করলেও, চলতি বছরের শুরুতেই জঙ্গল সলিমপুর নতুন করে জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের ওপর সশস্ত্র হামলায় এক র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
এই প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার (৯ মার্চ) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও পুলিশের ৪ হাজার সদস্য যৌথ অভিযান চালায় জঙ্গল সলিমপুরে। ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭টি পাইপগান, ১ হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলিসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি ২২ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা)।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য তুলে ধরেছে।
জঙ্গল সলিমপুরে আর্মি, র্যাব ও পুলিশের এই বিশেষ যৌথ অভিযান এলাকাটিকে ঘিরে সৃষ্ট সংকটকে জাতীয় পরিসরে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। 'দেশের ভেতর আরেক দেশ' হিসেবে পরিচিত এই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা ছিল বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আগ্রহ ও কৌতূহলের অন্ত নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি আসলে কী? জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে কেন এত আলোচনা? আর কী-ইবা আছে এখানে? বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে চলুন এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজে দেখা যাক।
জঙ্গল সলিমপুর আসলে কী?
চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ৩,১০০ একর বিস্তৃত এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হলো জঙ্গল সলিমপুর। এটি সরকারি খাসজমি হলেও গত কয়েক দশক ধরে এখানে গড়ে উঠেছে এক বিশাল জনবসতি।
এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে, যেখানে অন্তত দেড় লক্ষ মানুষের বসবাস। এদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষ।
বাংলাদেশের অংশ হলেও দীর্ঘদিন এই এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। বাস্তবে এই এলাকাটি স্থানীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। অভিযোগ আছে, এখানকার বাসিন্দাদের জন্য এমনকি আলাদা পরিচয়পত্র ইস্যু করেছিল সন্ত্রাসীরা, যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
দুই পাশে পাহাড় এবং মাঝখানে সরু রাস্তা এলাকাটিকে অনেকটা দুর্গের মতো সুরক্ষা দেয়। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলেই সেখানে সহজে প্রবেশ করতে পারত না।
হঠাৎ কেন আলোচনায়?
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘকাল ধরে 'সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল' হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা একে খবরের শিরোনামে নিয়ে এসেছে।:
র্যাবের ওপর হামলা ও কর্মকর্তা নিহত
গত ১৯শে জানুয়ারি কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে হামলার শিকার হয় র্যাব-৭ এর একটি দল। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪-৫শ লোক দেশীয় অস্ত্র ও গুলি নিয়ে র্যাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং আরও কয়েকজন সদস্য আহত হন। এটি ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি বড় ধাক্কা।
চার হাজার সদস্যের মেগা অভিযান
র্যাব কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের জবাব এবং ওই এলাকায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৯ই মার্চ সোমবার ভোর থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি একযোগে বিশাল অভিযান শুরু করে। প্রায় চার হাজার সদস্যের এই অভিযানে ড্রোন এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
জঙ্গল সলিমপুরে নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে যারা
জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে প্রায়শই গোলাগুলি ও খুনাখুনির মতো ঘটনার কথা জানা যায়। নব্বইয়ের দশকে বন বিভাগের কর্মচারী আলী আক্কাস এখানে বসতি স্থাপন করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও পরে তা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের হাতে চলে যায়।
যৌথ অভিযানের আগ পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ‘ইয়াসিন গ্রুপের’। এই গ্রুপের সদস্যরাই র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এলাকায় সক্রিয় রয়েছে আরও দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ: রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ।
পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া এবং মাদক ব্যবসার মতো অপরাধের সাথে জড়িত এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় জঙ্গল সলিমপুরে।
প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগে কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করে পার পেয়ে যেত। বিশেষ করে সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রশাসনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিত। ফলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসনকে পিছু হটতে হতো।
তাছাড়া দুর্গম এলাকায় অভিযান চালানো বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল স্থানীয় প্রশাসনের জন্য। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিজেদের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিরও সহায়তা নিত। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য জঙ্গল সলিমপুরে পৌঁছে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা এবং এলাকাটি অপরাধমুক্ত করা ছিল বেশ কঠিন একটি কাজ।
সোমবার চ্যালেঞ্জিং এই কাজটিই বাস্তবে করে দেখিয়েছে যৌথবাহিনী। গতকালের অভিযানের পর চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ জানিয়েছেন, এখন থেকে জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ ও র্যাবের দুটি স্থায়ী ক্যাম্প থাকবে। এলাকায় কোনো চেকপোস্ট বা প্রতিবন্ধকতা রাখা হবে না এবং প্রয়োজন হলে নিরাপত্তার জন্য কামানও মোতায়েন করা হবে।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারের শাখা, মডেল মসজিদ ও নভোথিয়েটারের মতো সরকারি প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে তা থমকে আছে। এখন স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে ওই এলাকায় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।