বন্যা বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পানিবন্দী সমতল ভূমি। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন তো—সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে থাকা পাহাড়ি এলাকায় যখন বন্যার পানি ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়? দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট এবং চট্টগ্রাম বিভাগ এখন ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি। ১০ লাখের বেশি মানুষ আজ পানিবন্দী। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মরদেহ দাফনের জন্য এক ফালি শুকনো জমিও মিলছে না! কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, পাহাড়ি এলাকায় কেন এমন বন্যা হয়? কেন সাধারণ বৃষ্টির পানি এখানে রূপ নেয় এক মরণফাঁদে? আজ আমরা এর পেছনের ভৌগোলিক ও মানবসৃষ্ট কারণগুলো জানব।
অতিবৃষ্টির নতুন রেকর্ড
পাহাড়ের বন্যার প্রথম এবং প্রধান প্রাকৃতিক কারণ হলো ভৌগোলিক অবস্থান এবং অতিবৃষ্টি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে প্রতি বছরই এই অঞ্চলে বৃষ্টি হয়। কিন্তু এবারের বৃষ্টিপাত ছিল অস্বাভাবিক। কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চলেই গত এক সপ্তাহে রেকর্ড ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ১ দিনেই সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস যখন চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলোতে বাধা পায়, তখন মেঘ জমে অবিরাম ভারী বর্ষণ শুরু হয়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এই বিপুল পানি যখন একযোগে নিচে নেমে আসে, তখনই সৃষ্টি হয় ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ বা আকস্মিক বন্যা।
ভারতের উজানের পাহাড়ি ঢল
পাহাড়ি বন্যার দ্বিতীয় কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের সীমান্ত ও নদীগুলোর চরিত্রে। সিলেট ও চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড়ি নদী এসেছে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম বা মেঘালয়ের উজান থেকে। ভারতের ওই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে যখন ভারী বৃষ্টি হয়, তখন সেই পানি তীব্র গতিতে বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে নেমে আসে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি হবিগঞ্জের লস্করপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। ভারতের ডম্বুর বাঁধ কিংবা পাহাড়ি নদীগুলোর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি যখন আমাদের দেশের নদীগুলো আর সইতে পারে না, তখনই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্রামকে গ্রাম প্লাবিত হয়। সমতল ভূমির বন্যার মতো এই পানি ধীরে ধীরে আসে না; বরং পাহাড়ি ঢলের পানি আসে সুনামির মতো গতিতে, যা মানুষকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগও দেয় না।
নির্বিচারে পাহাড় কাটা
তবে এই বন্যার জন্য কি কেবল প্রকৃতিই দায়ী? উত্তর হলো—না। আমাদের নিজেদের কিছু ভুল এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে গত কয়েক দশকে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে যে গাছপালা থাকে, তা বৃষ্টির পানিকে স্পঞ্জের মতো শুষে নেয় এবং মাটিকে ধরে রাখে। কিন্তু পাহাড় কাটার ফলে মাটি আলগা হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টি হলেই শুরু হয় পাহাড়ধস। এবারের বন্যায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে যে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে, তার বড় কারণ এই পাহাড়ধস। শুধু তাই নয়, পাহাড় কাটার সেই আলগা মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে এসে সরাসরি পড়ছে আমাদের নদীগুলোতে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, নদীগুলোর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর পানি ধারণক্ষমতা একদম কমে গেছে। ফলে সামান্য ঢল আসলেই নদী উপচে চারপাশ প্লাবিত হচ্ছে।
অপরিকল্পিত অবকাঠামো
পাহাড়ের পানি প্রাকৃতিকভাবেই নিচের দিকে নেমে সাগরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, কালভার্ট এবং বসতি স্থাপনের কারণে পানি নামার প্রাকৃতিক পথ আজ অবরুদ্ধ। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে আটটি জেলায় প্রায় ১৯ হাজার ৮৬৯ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, আর্থিক ক্ষতি ইতিমধ্যে ২৪৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পানি আটকে থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দিনের পর দিন পানির নিচে তলিয়ে থাকছে, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরি হচ্ছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়।
সিলেট ও চট্টগ্রামের বন্যা আমাদের পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্রকৃতির ওপর আমাদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। পাহাড় কাটা বন্ধ করা, নদীগুলোর তলদেশ ড্রেজিং করা এবং ভারতের সাথে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল এই স্থায়ী সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। দেশের এই দুর্যোগে দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার মানবিক দায়িত্ব।



