সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ কিংবা মৌলভীবাজার—বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই হাওর জনপদে এখন একটাই দৃশ্য: পানি আর আতঙ্ক। বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান যখন গোলায় তোলার সময়, ঠিক তখনই হানা দিয়েছে অকাল বন্যা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন প্রতিবছর এই অঞ্চলের কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে প্রকৃতি? কেন বারবার ডুবছে সিলেট অঞ্চল?
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ
গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৫৬ সেন্টিমিটার। নেত্রকোনায় কংস নদের পানি বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে এখনো ৫০ শতাংশ এবং নেত্রকোনায় ৪৬ শতাংশ ধান মাঠেই রয়ে গেছে। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড বৃষ্টির ফলে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল মুহূর্তেই তলিয়ে দিচ্ছে শত শত হেক্টর জমি। হাজারো কৃষক এখন তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে—বছরের একমাত্র স্বপ্ন কি তবে পানিতেই মিশে যাবে?
বারবার কেন সিলেট অঞ্চলেই বন্যা?
সিলেট অঞ্চলে বারবার বন্যার তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. ভৌগোলিক অবস্থান: সিলেটের উত্তরেই ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি, যা বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। ওখানকার পাহাড় থেকে আসা সব পানি বাংলাদেশের এই নিচু হাওর এলাকা দিয়েই প্রবাহিত হয়।
২. নদীর নাব্যতাহ্রাস: নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির বাড়তি পানির চাপ নদীগুলো সইতে পারে না এবং দ্রুত দুকূল ছাপিয়ে হাওরে ঢুকে পড়ে।
৩. অকাল বৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষার আগেই অতিবৃষ্টি আর ঢল শুরু হচ্ছে। ফলে ধান পাকার আগেই এ অঞ্চলে পানি চলে আসছে।
৪. অবকাঠামোগত ত্রুটি: হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো অনেক সময় দুর্বল থাকে। মধ্যনগরের এরনবিল বা বিশ্বম্ভরপুরের হরিমণি বাঁধের মতো অনেক জায়গায় পানি উপচে পড়ছে। সঠিক সময়ে বাঁধ মেরামত না হওয়া এবং অপরিকল্পিত স্লুইস গেটের কারণেও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এখন কী করতে হবে?
বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের বেশ কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন:
দ্রুত ফসল কাটা: কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ পেকে গেছে এমন ধান দ্রুত কেটে ফেলতে হবে।
বাঁধ তদারকি: স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাঁধের ফাটল দ্রুত মেরামত করতে হবে।
সরকারি সহায়তা: ঋণগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি প্রণোদনা এবং যাঁরা নিঃস্ব হয়েছেন, তাঁদের জন্য দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।