ধেয়ে আসছে ‘সুপার এল নিনো’, সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর শঙ্কা

একবার কল্পনা করুনতো— একদিকে আফ্রিকা মহাদেশ পুড়ছে তীব্র গরমে, অন্যদিকে ব্রাজিলে ডুবে যাচ্ছে পুরো এক শহর। আর এই দুটো ঘটনার পেছনে একটিই কারণ। বিজ্ঞানীরা যাকে বলছেন— ‘সুপার এল নিনো’। তারা এও বলছেন, এটা হতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ‘এল নিনো’। 

প্রশ্ন হচ্ছে, এই এল নিনো বা সুপার এল নিনো আসলে কী? বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ? বাংলাদেশ কি এর প্রভাবমুক্ত, নাকি আমদের জন্যেও অপেক্ষা করে আছে ভয়ঙ্কর কোনো বিপর্যয়? চলুন এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।
‘এল নিনো’ বা ‘সুপার এল নিনো’ কী?

এল নিনো আসলে একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। সহজ করে বললে, প্রশান্ত মহাসাগরের পানি হঠাৎ গরম হয়ে যায় এবং তার প্রভাব পড়ে গোটা পৃথিবীর আবহাওয়ায়। এটা কয়েক বছর পরপরই ঘটে। কিন্তু সমুদ্রের পানি যখন খুব বেশি গরম হয়ে যায়, তখন একে বলা হয় ‘সুপার এল নিনো’।

কিন্তু এবছর ‘এল নিনো’ রীতিমতো রেকর্ড ভাঙছে। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে— যা ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। আর সবচেয়ে ভয়ের কথা কী জানেন? এটা এখনো তার সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায়নি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিসেম্বর নাগাদ এটা আরও শক্তিশালী হবে।

মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক?
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক একটি ভয়ঙ্কর আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, এই ‘এল নিনোর’ প্রভাবে শুধু গরমেই মারা যেতে পারে বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ। আর এতে সবচেয়ে বেশি ভুগবে অপেক্ষাকৃত গরিব বা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো। নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান— এই দেশগুলোতেই মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হতে পারে। কারণটা বেশ অনুমান করা যায়— ধনী দেশগুলোর কাছে আছে ফায়ার সার্ভিস, ভালো হাসপাতাল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর। কিন্তু গরিব দেশগুলোতে এসব সুবিধা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশের কী প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশও এই ‘সুপার এল নিনোর’ প্রভাব থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। গবেষকদের হিসাবে, এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত- এই ছয় মাসেই বাংলাদেশে ৬০০-র বেশি মানুষ তীব্র গরমজনিত কারণে মারা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম— অর্থাৎ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল।

শুধু গরম নয়, এর সঙ্গে যোগ হতে পারে অনিয়মিত বৃষ্টিও— ফলে কোথাও খরা, আবার কোথাও হঠাৎ বন্যা দেখা যেতে পারে। আর এমনটা হলে পানির সংকট যেমন তীব্র হবে, তেমনি নষ্ট হবে কৃষকের ফসল, বাড়বে খাদ্যপণ্যের দাম।

বিশ্বজুড়ে কী ঘটবে?
বিশ্বজুড়ে চিত্রটা আরও ভয়ংকর। জাতিসংঘের হিসাবে, এই এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। ভারতে চালের উৎপাদন কমতে পারে গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে। দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, আর অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। আবার দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে হতে পারে ভয়াবহ বন্যা।

আপনাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০২৪ সালে ব্রাজিলের এক শহরে বন্যায় ৬ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল। সেটা ছিল ‘এল নিনোর’ ছোট একটি নমুনা মাত্র। এবার তার চেয়েও ভয়াবহ কিছুর আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। এখন প্রশ্ন হলো— এল নিনো তো আগেও এসেছে, তাহলে এবার কেন এতটা ভয়ংকর?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, মানুষ কয়লা-তেল পুড়িয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা আগে থেকেই প্রায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়ে রেখেছে। তার ওপর ‘এল নিনো’ যুক্ত হলে, সেই উত্তাপ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একজন বিজ্ঞানী তো বিষয়টিকে ‘ভবিষ্যতের একটি পোস্টকার্ড’ হিসেবে দেখছেন। আগামী কয়েক দশকে এমন অস্বাভাবিক, তীব্র গরম-ই হয়তো স্বাভাবিক হয়ে উঠবে; সেটাও আবার এল নিনো প্রভাব ছাড়াই।

প্রতিকার কী? 
ভয়ঙ্কর এই নিরাশার মাঝেও অবশ্য আশার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। সময়মতো তাপ-সতর্কতা জারি করা, পর্যাপ্ত কুলিং সেন্টার তৈরি করা, বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করা, এবং হাসপাতালগুলোকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা- এই পদক্ষেপগুলো বাঁচাতে পারে লাখো মানুষের প্রাণ।

সার্বিকভাবে ‘সুপার এল নিনো’ কতটা ভয়ংকর হবে— সেটা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার— এই বিপর্যয়ের আশঙ্কা কোনো কল্পকাহিনী নয়, বরং কঠিন বাস্তব। আর এটি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই সময়।