রোগী ভর্তি মুগদা হাসপাতালে, টেস্ট ‘করতে হচ্ছে’ বেসরকারি ব্যবস্থায়

সরকারি হাসপাতালে ঢুকে রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করছেন বেসরকারি ডায়াগনস্টিকের কর্মীরা। রাজধানীর মুগদা হাসপাতালের চিত্র এমনই। পরীক্ষার রিপোর্টও হাসপাতালেই দিয়ে যাওয়া হয়। অথচ এসব পরীক্ষা মুগদা হাসপাতালে করতে অর্ধেক খরচ হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব জেনেও জানে না। পুরো প্রক্রিয়াটিকে অপরাধ বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সরেজমিনে মুগদা হাসপাতালে ঘুরে বেশ কিছু লোকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘সিবিসি টেস্ট লাগবে, সিবিসি টেস্ট? রক্ত পরীক্ষা লাগবে রক্ত পরীক্ষা?’ ওই হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এ যেন রক্তের ফেরিওয়ালা।

অনুসন্ধানে নেমে দেখা হয় আমেনা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি জমজম ডায়াগনস্টিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। তাঁকে মুগদা হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড থেকে রক্ত নিতে দেখা যায়। পরে তার ডায়াগনস্টিক থেকে পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেন রোগীকে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমেনা বেগম বলেন, ‘সিবিসিগুলো ডিসকাউন্ট সরকার দেয় না। তারপরেও যারা গরীব, অসহায়, আমি তাদের কাছ থেকে সাড়ে তিন শ বা তিন শ করে নেই, নইলে ৪০০ টাকাই নিতাম।’

এদিকে মঙ্গলবার সকালে একের পর এক রোগীর রক্ত সংগ্রহ করতে দেখা যায় এক ব্যক্তিতে। অস্টম শ্রেণি পড়ুয়া এই ব্যক্তির নাম রিজভী খান রাকিব। তিনি নিউ সততা ডায়াগনস্টিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সেলস অফিসার।

অন্যদিকে মুগদা ডায়াগনস্টিকের ইমন নামের আরেক ব্যক্তিকে সরকারি হাসপাতালের রোগীকে তার প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যেতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নামতে দেখা যায়।

তবে কেন রোগীরা বাইরের ডায়াগনস্টিক থেকে রক্ত পরীক্ষা করছেন। যেখানে মুগদা হাসপাতালের চেয়ে খরচ কয়েকগুণ বেশি?

এ বিষয়ে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘যে চেম্বারে টেস্টের জন্য দিছে, সেখানে রোগী নিয়ে যাইতে হবে। কিন্তু আমার রোগী তো অসুস্থ। এগুলা বললে তারা (দায়িত্বরত কর্মকর্তারা) বলে–এগুলা তোমাদের ব্যাপার।’

মুগদা হাসপাতালে ভর্তি এক নারী রোগী বলেন, ‘এত সিরিয়াল ওইখানে যে দাঁড়ায়ে থাকতে চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে পড়ে যাই। কয়টা টাকার জন্য কি জীবন দিয়া দিমু, কন!’

এসব জানার পর সততা ডায়াগনস্টিকের দিকে যায় ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন। সেখানে গিয়ে পাওয়া যায় সেই রাকিবকেও। তার হাতে দেখা যায়, মুগদা হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা।

রাকিবের দাবি, এসব নমুনা সংগ্রহ করে দিয়েছে মুগদা হাসপাতালের নার্স। তার কোনো মেডিকেল টেকনিশিয়ানের সার্টিফিকেট নেই। পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। 

রিজভী খান রাকিব বলেন, ‘আমরা অনুমতি ছাড়া তো আর স্যাম্পল নেই না।’ পড়াশোনা কত দূর করেছেন–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা করেছি অস্টম শ্রেণি পর্যন্ত।’

পাশের জমজম ডায়াগনস্টিকে গিয়ে জানা গেল, তাদের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুনে। আর সততা ডায়াগনস্টিকের দাবি তারা সরকারি হাসপাতাল থেকে রক্ত সংগ্রহ করে না। 

এক প্রশ্নের জবাবে সততা ডায়াগনস্টিকে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের এইখানে টেস্ট হয়, এই জন্য রোগীরা টেস্ট করাইতে আসে।’

আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এরকমভাবে আমাদের কাজ করার কোনো দিক নির্দেশনা নেই। কেউ সেটা করে থাকলে সে নিজ থেকে করেছে।’ 

অখ্যাত এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যখন রক্ত সংগ্রহ করছিলেন, তখন মুগদা হাসপাতালের ওয়ার্ডে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে নার্স সবাই ছিলেন। তারপরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য-প্রতিবেদকের তথ্য সঠিক নয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুগদা হাসপাতাল উপ-পরিচালক ডা. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘দুঃখিত আমি আপনার সাথে একমত হতে পারছি না, কারণ সরকারি হাসপাতালে এই ধরনের কোনো সুযোগ নেই। সেখানে আমাদের নজরদারি আছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সরকারি হাসপাতালে বাইরে থেকে এসে রক্ত সংগ্রহ করা অপরাধ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘সিবিসি বা অন্যান্য রিপোর্ট যেগুলোর জন্য আপনার দেখানো ভিডিও অনুযায়ী বাইরে থেকে নিয়ে করানো খুবই দুঃখজনক। এটি নিয়ে কালকেই বিষয়টি দেখব।’

এসব ডায়াগনস্টিকের রিপোর্টের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।