সিরাজগঞ্জে গত এক মাসে তিনটি মাজারে ভাংচুর করেছে মাজার বিরোধীরা। এই মাজার ভাংচুর শুরু হয় কাজীপুর উপজেলার যমুনার দুর্গম চর মনসুর নগর ইউনিয়ন থেকে। এরপর দুটি মাজার ভাংচুর করা হয়েছে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায়।
সর্বশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলায় শিয়ালকোল ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে অবস্থিত হজরত বড়পীর গাউসুল আজম দরবার শরিফে হামলা করে তিনটি কবর ভাংচুর এবং কবর থেকে মরদেহের দেহাবশেষ নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। এসময় মাজারের বিভিন্ন স্থাপনা ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। শত শত লোক জমায়েত হয়ে এমন তাণ্ডব চালালেও কেউ বাধা দেয়নি। এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে ঐ এলাকায়।
হজরত বড়পীর গাউসুল আজম দরবার শরিফ মাজারের খাদেম হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে একদল মাদ্রাসা ছাত্র আর মৌলভিরা মিছিল নিয়ে এসে মাজারে হামলা করে। এসসয় তারা হাতুড়ি, শাবল, দুরমুজ, রড ও লাঠিসোঁটা দিয়ে মাজারের বিভিন্ন স্থপনা ভাংচুর করে। তারা পুর্ব প্রস্তুতি নিয়েই এই হামলা করেছে। তারা মাজারের তিনটি কবর খুরে দেহবাশেষ নিয়ে গেছে। থানার ওসির কাছে মৌখিকভাবে জানিয়েছি। তিনি আমাকে লিখিতভাবে অভিযোগ করতে বলেছেন।’
এই ঘটনার বিচার চেয়ে হজরত বড়পীর গাউসুল আজম দরবার শরিফ মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে মাজারের কার্যক্রম চললেও কেউ কোনোদিন বাধা দেয়নি। কিন্তু এবার প্রকাশ্যে ‘তৌহিদি জনতার’ নাম ভাঙিয়ে মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। কবর থেকে মানুষের দেহাবশেষ তুলে নেওয়া হয়েছে– এটা কেমন বর্বরতা।’
হামলাকারীদের বিচার দাবি করেছেন ভূমিদাতা শাহ সুফি ফকির শহিদ শাহের বৃদ্ধা মা ওমিছা বেগম।
মাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াহাব কালু বলেন, ‘স্থানীয় বহুলী ইউনিয়নের বেড়াবাড়ি গ্রামের শাহ সুফি ফকির শহিদ শাহ ১৫ শতক এবং শিয়ালকোল ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের খাজা সফুরা পাগলী ৫ শতক মিলে মোট ২০ শতক জায়গা ২০০৫ সালে হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) দরবার শরীফের নামে ওয়াকফ্ করে দিয়েছেন। এরপর থেকে এখানে দরবার শরীফের কার্যক্রম চলতে থাকে। ২০০৭ সালে রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা তরিকায়ে কাদরিয়ার অনুসারী দরবেশ আলতাফ শাহ, ২০১৪ সালে মাজারের ভূমিদাতা শাহ সুফি ফকির শহিদ শাহ ও ২০১৬ সালে ভূমিদাতা খাজা সফুরা পাগলী মারা গেলে দরবার শরিফেই তাদের আলাদা কবর দেওয়া হয়। প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার এবং প্রতি মাসের পূনির্মার রাতে দরবার শরিফে জিকির, মিলাদ মাহফিল ও মুর্শিদী গানের আয়োজন শেষে তবারক বিতরণ করা হয়। বড় বড় শিল্পীরা এখানে গান-বাজনা করতে আসেন। এখানে হাজার হাজার ভক্তের আগমন ঘটে। এত দিন এসব কাজে কেউ বিরোধিতা করেনি। কিন্তু এখন মাজারগুলোয় হামলা চালিয়ে ক্ষতি করা হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মাজার ভাংচুরের কথা শুনেছি। তবে এ বিষয়ে এখনো কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে ২৯ আগস্ট কাজিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল মনসুরনগর ইউনিয়নের বামনজানি বাজারের পাশে অবস্থিত আলী পাগলার মাজার ভাংচুর করে মাজার বিরোধীরা।
গত ৩ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর গ্রামের ইসমাইল পাগলার মাজার ভাংচুর করা হয়। স্থানীয়রা জানায়, মাজারের আশেপাশের গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এসে এই মাজারটি ভাংচুর করেছে। প্রতি বৃহস্পতিবার ইসমাইল পাগলার ভক্তরা মাজারে এসে জিকির-আসকার করত। এখানে অশ্লীল কোনো কার্যক্রম হত না। ইসমাইল পাগলা ২০১৩ সালের এপ্রিলে (বাংলা ২৭ চৈত্র) মৃত্যুবরণ করেন। রাতে দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর হাজার হাজার জানাজায় ছুটে আসে। পরে বাড়ির পাশে নিজস্ব জায়গায় তাঁকে দাফন করা হয়। ইসমাইলের ভক্তরাই এই মাজার তৈরি করেছে। প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এখানে বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। এসকল ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ দাখিল করেনি।
জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকায় হযরত শাহ সুফি আফজাল, এনায়েতপুরে খাজা এনায়েতপুর এবং শাহজাদপুরে হয় শাহ মখদুমের মাজার রয়েছে। এছাড়া ছোট ছোট আরও অর্ধশতাধিক মাজার রয়েছে । তবে এসকল মাজারের নিরাপত্তা বিধানে প্রশাসনের কোনো ভূমিকা নেই।