দীর্ঘ ১১ বছর পর রংপুরের চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে মামলার এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী তাদের অন্যান্য দণ্ডও দেওয়া হয়। বুধবার দুপুরে রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মসিউর রহমান খান এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির নাম হেকরম। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া অপর দুই আসামি হলো– এলিন ও শুভ কুমার। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর তিন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে আসামি, তাদের আইনজীবী, বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নিহত সাংবাদিকের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট নন নিহত সাংবাদিকের মা ও মামলার বাদী নুরজাহান বেগম। দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষার পর রায় পেলেও প্রত্যাশিত বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ তাঁর কণ্ঠে। নুরজাহান বেগম বলেন, ‘দীর্ঘ ১১ বছর পর মামলার রায় হলো। কিন্তু আমরা যে বিচার প্রত্যাশা করেছিলাম, তা পাইনি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবার বিরুদ্ধে যথাযথ বিচার নিশ্চিত হবে।’
নুরজাহান বেগমের অভিযোগ, একজন সাংবাদিককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার পর থেকে তারা দীর্ঘদিন বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। এত বছর পর রায় ঘোষণার দিনেও পরিবারের মধ্যে স্বস্তির বদলে হতাশা তৈরি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা যথাযথভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রত্যাশা ছিল তাদের।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৫ সালে স্থানীয় দৈনিক ‘যুগের আলো’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মশিউর রহমান ওরফে উৎসকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর রংপুরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সাংবাদিক হত্যার বিচার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সাংবাদিক সমাজ, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন সময়ে কর্মসূচি পালন করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মা নুরজাহান বেগম কোতয়ালী থানায় আটজনকে আসামি করে মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচারিক কার্যক্রম। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার মামলাটির রায় ঘোষণা করা হলো।
আদালতের রায়ে একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী অন্যান্য দণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর তিন আসামি খালাস পেয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে নিহত সাংবাদিকের স্বজনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে, অন্যদিকে সব আসামির বিরুদ্ধে সাজা না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিক উৎস হত্যার বিচার নিয়ে রংপুরের সাংবাদিক মহলেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন সাংবাদিকরা। ১১ বছর পর রায় ঘোষণায় বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলেও পরিবারের অসন্তোষের কারণে মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এখন রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর বাদীপক্ষ ও আসামিপক্ষের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা। উচ্চ আদালতে আপিলসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় মামলাটি কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর রায় এলেও নিহত সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎসের পরিবার মনে করছে, তাঁদের প্রত্যাশিত পূর্ণাঙ্গ বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি।
রায় ঘোষণার পর বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘রায়ে আমরা কতটা সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট, সেটি মামলার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সঙ্গে সম্পর্কিত। আদালতের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল হাদি বেলাল বলেন, ‘আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে রায় দিয়েছেন। মামলায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের খালাস দেওয়া হয়েছে।’