বলিউডের ‘হি-ম্যান’; যাঁর নাম শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে শক্তি, রোমান্স আর অদম্য সাহসের প্রতিচ্ছবি। বহু সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি কালের স্রোতে নিজেকে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করেছেন। নামটা ধর্মেন্দ্র। যখন তাঁর বয়স ৪৪ পেরিয়েছে, সংসারে আছে চার সন্তান। ক্যারিয়ার তখন মধ্যগগনে। যে ছবিতেই হাত দিয়েছেন, তাতেই দর্শকদের উন্মাদনা। এমন সফলতার উচ্চ শিখরে দাঁড়িয়েই তিনি জীবনের এক নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিলেন, যা আজও বলিউডের ইতিহাসে এক আলোচনার বিষয়। তিনি বিয়ে করলেন বলিউডের ‘ড্রিম গার্ল’ হেমা মালিনীকে।
১৯৮০ সালে যখন ধর্মেন্দ্র হেমা মালিনীকে বিয়ে করেন তাঁর প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর ও চার সন্তান ছিল। হেমা ছিলেন তাঁর চেয়ে ১৩ বছরের ছোট। এই বিয়ে সেই সময় গোটা ভারতজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। সমাজের এক বিরাট অংশ ধর্মেন্দ্রকে ‘নারীলোভী’ আখ্যা দিতে দ্বিধা করেননি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে তাঁকে নিয়ে শুরু হয়েছিল তীব্র সমালোচনা। অনেকে তো তাঁকে বয়কট করারও ডাক দিয়েছিলেন, কারণ তাঁদের মতে, ধর্মেন্দ্র তাঁর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে সুবিচার করেননি।
তবে, সমস্ত বিতর্কের মুখে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ধর্মেন্দ্রর প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর। তাঁর নীরব সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে দেওয়া সাহসী বিবৃতি সব সমালোচনার সুর কিছুটা হলেও বদলে দিয়েছিল। একজন স্ত্রী এবং চার সন্তানের জননী হয়েও তিনি মনের কষ্ট বুকে চেপে দাঁড়িয়েছিলেন স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পক্ষে।
প্রকাশ কৌরের অবিস্মরণীয় উক্তি
১৯৮০ সালে হেমা মালিনীকে বিয়ে করার পরও ধর্মেন্দ্র তাঁর প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌরকে তালাক দেননি। তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক আজও বিদ্যমান। ধর্মেন্দ্রর দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রকাশ কৌর স্বামীর পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেন। ১৯৮১ সালে ‘স্টারডাস্ট’ পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শুধু আমার স্বামী কেন? যেকোনো পুরুষই আমার চেয়ে হেমাকেই বেছে নিতেন।’
তাঁর এই মন্তব্য সেই সময়ে অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীকে নারীলোলুপ বলা কীভাবে চলে? যখন পুরো ইন্ডাস্ট্রির অর্ধেক মানুষই একই কাজ করছে!’ প্রকাশ কৌর সেই সময়ের বলিউডের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সব নায়কই সম্পর্ক করছে, কেউ কেউ দ্বিতীয়বার বিয়েও করছে। আমার স্বামী হয়তো সেরা স্বামী নন, তবে তিনি দারুণ একজন বাবা। তাঁর সন্তানরা তাঁকে খুব ভালোবাসে। তিনি কখনও তাদের অবহেলা করেননি।’
প্রকাশ কৌর এমনকি হেমা মালিনীর প্রতিও সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি বুঝি, হেমা কী পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। তাঁকেও সমাজ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের মুখোমুখি হতে হয়। তবে আমি যদি হেমার জায়গায় থাকতাম, আমি ওভাবে করতাম না। একজন নারী হিসেবে আমি তাঁর অনুভূতি বুঝি। কিন্তু একজন স্ত্রী ও মা হিসেবে তা মেনে নিতে পারি না।’
একটি জটিল পারিবারিক সমীকরণ
ধর্মেন্দ্রর এই সিদ্ধান্ত বলিউডের পারিবারিক কাঠামোর এক অন্যদিক তুলে ধরেছিল। প্রথম স্ত্রী ও চার সন্তানকে না ছেড়ে দ্বিতীয় বিয়ে করার ঘটনা সেই সময়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ধর্মেন্দ্র ও প্রকাশ কৌরের সংসারে রয়েছে দুই পুত্র সানি দেওল, ববি দেওল এবং দুই কন্যা বিজেতা ও অজিতা দেওল। অন্যদিকে, হেমা মালিনীর সাথে তাঁর দুই কন্যা এশা দেওল ও অহনা দেওল।
এই জটিল পারিবারিক সম্পর্ক সত্ত্বেও ধর্মেন্দ্র তাঁর সব সন্তানের প্রতিই সমান দায়িত্বশীল ছিলেন। সানি ও ববি দেওল বলিউডে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছেন, যা তাঁদের বাবার পথ অনুসরণ করেই। হেমা মালিনীর সাথে তাঁর বিবাহিত জীবন সফল এবং সুদীর্ঘ হয়েছে।
ধর্মেন্দ্রর জীবন শুধু সিনেমার পর্দায় নয়, ব্যক্তি জীবনেও ছিল নাটকীয়তা ও আবেগে ভরপুর। তাঁর প্রেম, বিতর্ক এবং পারিবারিক টানাপোড়েন আজও বলিউডের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে কিংবদন্তিদের জীবন শুধু সাফল্যের গল্পই নয়, তা মানব জীবনের জটিল সম্পর্কের এক দর্পণও বটে।