শয়তানের রান্নাঘরে হারিয়ে গেছে বন্ধু, এখন?

মনজুমাল বয়েজ সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি থেকে নেওয়া

খুবই সাধারণ আটপৌরে গল্পের ঢঙে শুরু। বিয়ের আসরে দেখা যায় একদল বন্ধুকে। জীবনধারণের জন্য তারা বিভিন্ন কাজ করে। কেউ রড কাটে, কেউ আবার করপোরেট লুকে চাকরি করে। তবে ডালপালা ছড়িয়ে যেখানেই যাক, সবার শেকড় এক জায়গাতেই। সেখানে সবাই এক, সেখানে সবাই হরিহর আত্মা। আর এই একাত্মতার চিত্র তীব্র হয়ে ওঠে ছবির সময় যত গড়ায়, তত।

বলছি ‘মনজুমাল বয়েজ’ নামের সিনেমার কথা। সত্য ঘটনার ওপর নির্ভর করে বানানো এই চলচ্চিত্রটি ভারতজুড়ে সাড়া ফেলেছে। যদিও এটি মূলত মালায়লাম ভাষার ছবি, কিন্তু এর আবেদন সব ভাষার সব মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে। তা নইলে কি আর আইএমডিবি’তে প্রায় সাড়ে ৮ ছুঁই ছুঁই রেটিং থাকে!

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ভারতে মুক্তি পায় ‘মনজুমাল বয়েজ’। কেরালার একদল বন্ধুর গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবি। সত্য ঘটনা অবলম্বনে এর গল্প লিখেছেন চিদাম্বরম, পরিচালনাতেও ছিলেন তিনিই। এই বন্ধুরা সবাই মিলে তামিলনাড়ুর এক জায়গায় ঘুরতে যায়। তাদের এই দলের নামই ‘মনজুমাল বয়েজ’। মূলত যাপিত জীবনের যন্ত্রণা থেকে কিছুদিনের মুক্তির জন্যই ছিল এই ঘুরতে যাওয়া। তরুণদের মধ্যে তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা থাকে সব সময়ই। তা থেকেই একসময় সবাই এক রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতরে গিয়ে ‘যেতে মানা’ এমন এক গুহায় ঢুকে পড়ে। আর সেখানেই ঘটে দুর্ঘটনা। এক বন্ধু পড়ে যায় গুহার ভেতরে থাকা গর্তে। এই গুহা স্থানীয়দের কাছে ‘শয়তানের রান্নাঘর’ নামে পরিচিত ছিল। এমন নামকরণ শুনেই বুঝতে পারছেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও ভীতি ছিল ব্যাপক। কারণ ওই গর্তে পড়ে যাওয়া কাউকে যে কখনো জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। ফলে এক বন্ধু গুহার গর্তে পড়ে যাওয়ার পর খুব বিপদে পড়ে যায় মনজুমাল বয়েজ। কারও যে সাহসই ছিল না ওই গর্ত থেকে কাউকে উদ্ধার করার। তাহলে কি বন্ধুকে গর্তে ফেলেই ফিরতে হবে মনজুমাল বয়েজকে?

আরেকটি দৃশ্য। ছবি: আইএমডিবি থেকে নেওয়া

এই শেষের প্রশ্নটির উত্তর পাবেন ছবিটি শেষ পর্যন্ত দেখলেই। সিনেমাটিকে পরিচয় করানো হচ্ছে ‘সারভাইভাল থ্রিলার’ হিসেবে। সাধারণত হলিউডে এ ধরনের ছবি আমরা অনেক দেখেছি। কিন্তু এই উপমহাদেশের হিসাবে এমন ছবি কমই দেখা যায়। সেই সঙ্গে ‘মনজুমাল বয়েজ’-এর সিনেম্যাটোগ্রাফি নিয়ে আলাদাভাবে প্রশংসা করতেই হবে। দৃশ্যের সাথে মানানসই ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। সব মিলিয়ে, গল্পের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র যে পর্দায় ফুটে উঠেছে এবং তা অনুভব করা গেছে দারুণভাবে—সেটি মানতেই হবে।

এবার অভিনয়ের প্রসঙ্গে আসা যাক। অভিনয়শিল্পীরা বেশিরভাগই ছিলেন মালায়লাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির। গর্তে পড়ে হারিয়ে যাওয়া সুভাষের চরিত্রে ছিলেন শ্রীনাথ ভাসি। আরেক প্রধান চরিত্র সিজুর ভূমিকায় ছিলেন সৌবিন শাহির। দুজনেই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। একবারের জন্যও চরিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ভাবাবেগের অভাব তাঁদের মুখমণ্ডলে দৃশ্যমান হয়নি। শুধু তাঁরাই নন, বাকি যাঁরা বিভিন্ন চরিত্রে ছিলেন, প্রায় সবাই ছিলেন একেবারে নিখুঁত। অভিনয়ের বাড়াবাড়ি ছিল না কারও পারফরম্যান্সেই। বরং পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। ফলে দর্শকদের পক্ষে এর সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত হওয়াটা অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে।

অজান্তে মনে পড়ে যাবে শৈশব-কৈশোরের কথা। ছবি: আইএমডিবি থেকে নেওয়া

‘মনজুমাল বয়েজ’ কতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ব্যবসাসফল হয়েছে, তা বোঝানোর জন্য কিছু তথ্য দেওয়া যাক। মাত্র ২০ কোটি রুপি বাজেটে ছবিটি তৈরি হয়েছে। আর বক্স অফিসে এটি ব্যবসা করেছে প্রায় ২৫০ কোটি রুপি। এর আগে এমন ঘটনা দেখা গিয়েছিল ‘কান্তারা’ ছবির ক্ষেত্রে। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ওই সিনেমা ১৬ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত হয়েছিল, আর ব্যবসা করেছিল ৪০০ কোটি রুপির বেশি।

সিনেমাটি আসলে আবেগের গল্প, বন্ধুত্বের গল্প। সেই বন্ধুত্বের টান এতটাই যে, মৃত্যুর আশঙ্কাও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়! এই সিনেমা দেখতে দেখতে আপনারও অজান্তে মনে পড়ে যাবে শৈশব-কৈশোরের বা তরুণ জীবনের সব বন্ধুদের কথা। নস্টালজিক আপনি হবেনই। আর সিনেমার শেষে কখন যে চোখের কোণে দু’ ফোঁটা জল এসে ঝরে পড়ার অপেক্ষায় ক্ষণ গুণতে শুরু করে দেবে, তা আপনি বুঝতেই পারবেন না!

এমন সিনেমা তাই মিস না করাই ভালো। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ডিজনিপ্লাস হটস্টারে চলতি মাসেই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। তাই দেরি না করে বরং এই অপূর্ব গল্পের সিনেমাটি উপভোগ করেই ফেলুন।

রেটিং: ৪.৬/ ৫.০০

পরিচালক: চিদাম্বরম
গল্প ও চিত্রনাট্য: চিদাম্বরম 
অভিনয়শিল্পী: শ্রীনাথ ভাসি, সৌবিন শাহির, চান্দু সলিমকুমার, বালু ভারাগেসে, গণপতি এস, দীপক পরম্বাল প্রমুখ
ভাষা: মালায়লাম
ধরন: থ্রিলার, অ্যাডভেঞ্চার
মুক্তি: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক