
গান দিয়ে শুরু হয়ে খুনে শেষ। এভাবেই পর্দায় হাজির হয় কাহিনীর উপক্রমণিকা। এরপর ছাগলের মালিকানা নিয়ে কেস লড়া এক উকিলের গল্প শুরু হয়। কাহিনীর প্রবাহে একসময় বিপরীতে আবির্ভূত হয় এক দোর্দণ্ডপ্রতাপের আইনজীবী। এই নিয়ে চালু হয় আইনি লড়াই।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচ’। এটি একটি কোর্টরুম ড্রামা। কিছুদিন আগেই একই প্ল্যাটফর্মে এমনই একটি সিরিজ মুক্তি পেয়েছিল, নাম ‘মোবারকনামা’। তাতে আইনজীবীর ভূমিকায় ছিলেন গুণী অভিনেতা মোশাররফ করিম। গল্পের কাঠামোগত দিক থেকে দুটি সিরিজ কাছাকাছি। একই প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়ায় হয়তো সেই নৈকট্য আরও বেশি অনুভূত হয়েছে।
‘অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচ’-এর প্রথম সিজনের গল্প সম্পর্কে হইচই বলছে, ‘বিখ্যাত দত্ত বাড়ির ঐতিহ্যে দাগ লাগে যখন আত্মীয়-বন্ধু সমাগমের মাঝে তাদের উত্তরাধিকারী খুন হয় এবং সন্দেহ গিয়ে পরে তার স্ত্রী মালিনীর ওপর। সাধারণ, গোবেচারা আইনজীবী অচিন্ত্য আইচ মুখোমুখি হয় ধূর্ত আইনজীবী সীতারাম গাঙ্গুলির। সে কি পারবে দত্ত বাড়ির লুকোনো সত্যি বের করে মালিনীর জন্য বিচার আনতে?’

গল্প সম্পর্কে এতটুকু জেনে কি কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন? প্রথমে ‘মোবারকনামা’র প্রসঙ্গে আসা যাক। ওই সিরিজেও পেশা থেকে হারিয়ে যাওয়া একজন আইনজীবীকে অসম লড়াইয়ে নামতে হয়। অচিন্ত্য আইচের ঘটনাটাও কাছাকাছি। এক্ষেত্রে অচিন্ত্য একেবারেই অখ্যাত ব্যক্তি। এই দুই চরিত্রের ক্ষেত্রেই মিল অনেক। দুজনেরই একটি অতীত আছে, যা তাদের তাড়া করে বেড়ায়। দুজনেই শেষ পর্যন্ত হেরে যাওয়াকে ভবিতব্য ধরে নিয়েই প্রবল লড়াইয়ে নামে।
এ তো গেল দুই ওয়েব সিরিজের মধ্যকার মিল। আসল কথা হলো, এই দুই ওয়েব সিরিজ এবং এখনকার কোর্টরুম ড্রামার ফরম্যাট অনেক বেশি অনুকরণ করা বলিউডের ‘জলি এলএলবি’ ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে। সেই এক সূত্র মেনেই এতদঅঞ্চলের কোর্টরুম ড্রামাভিত্তিক সিনেমা বা সিরিজ নির্মিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন গল্পের নায়ক আইনজীবীকে আন্ডারডগ দেখাতেই হবে? কেন সেই চরিত্রে কৌতুকরস থাকতেই হবে? অর্থাৎ, এই ফরম্যাটের একটা পরিবর্তন খুবই প্রয়োজন। গল্প যেহেতু মৌলিক, সেখানে কাহিনীর কঙ্কাল কেন মৌলিক হবে না? একটু খাটলেই কিন্তু করা সম্ভব।

‘অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচ’-এর প্রথম সিজনও সেই একই দোষে দুষ্ট। হ্যাঁ, আইনি লড়াইয়ের কারণ আলাদা ও মৌলিক। বরং কোর্টরুম ড্রামাতেও রহস্য এনে হাজির করায় উপভোগ্য হয়েছে বেশ। সবচেয়ে বড় বিষয়, প্রধান চরিত্রগুলোর পাশাপাশি যেসব পার্শ্বচরিত্র ছিল, সেগুলোতে প্রায় সঠিক শিল্পী বাছাই করা হয়েছিল। ফলে পুরো সিরিজটা অভিনয়ের দিক থেকে ঝুলে যায়নি কখনোই। বরং বেশ ভারসাম্যপূর্ণ ছিল।
সিরিজটি পরিচালনা করেছেন জয়দীপ মুখার্জি। অভিনয়ে ছিলেন ঋত্বিক চক্রবর্তী, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দুলাল লাহিড়ী, লোকনাথ দে, অলকানন্দা রায়, দেবরাজ ভট্টাচার্য, খেয়া চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। অচিন্ত্য আইচের ভূমিকায় ঋত্বিক এক কথায় অনবদ্য। তাঁর অভিনয়ের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন আদৌ ছিল না এবং এই সিরিজে তিনি তা তোলার সুযোগও দেননি। দুর্বল আইনজীবীর চরিত্রের সবল হয়ে ওঠার যে যাত্রা, সেটি তিনি খুব সুন্দরভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে ধূর্ত আইনজীবীর চরিত্রে থাকা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যেত। তাঁর চরিত্রটিকে আরেকটু জায়গা ছেড়ে দিলে মন্দ হতো না। দেবরাজ ভট্টাচার্যের কমিক রিলিফ মনে ধরে দারুণভাবে। মালিনী চরিত্রটি যেভাবে তৈরি, তাতে সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করার ছিল না বেশি কিছু। সেদিক থেকে বলাই যায় যে, সুরঙ্গনার অভিনয়ের সক্ষমতাকে পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়নি। দুলাল লাহিড়ীকে পর্দায় দেখে ভালো লেগেছে। তবে এই শক্তিশালী অভিনেতাকে আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্র কেন দেওয়া হচ্ছে না, সেটি এক নিদারুণ আফসোস অবশ্যই।
সিরিজটিতে সিনেম্যাটোগ্রাফির কাজ ভালো। ৭ পর্বের সিরিজটির মাঝখানে গল্পের টানটান সুতো একটু আলগা মনে হলেও, শেষ দুই পর্বে সেই ঘাটতি পূরণ হয়ে গেছে। বিশেষ করে শেষটায় প্রত্যাশিত চমক পাওয়া গেছে। আর আদালতে যুক্তি-তর্কের বেলায় সমাপনী যে বক্তব্যটি অচিন্ত্য আইচ দিয়েছে, তা সত্যিই আকর্ষণীয়।
সব মিলিয়ে ‘অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচ’ দেখার অনুপযোগী নয়। বরং শেষটায় গিয়ে ভালোই বোধ হয়। নির্মাণ, গল্প ও শিল্পীদের অভিনয়ের বুনন মোটের ওপর খারাপ না। খাপছাড়া লাগে না কোথাও। আর ঋত্বিক চক্রবর্তী ও শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত চরিত্রের দ্বৈরথ দেখার সাধ থাকলে তো বলতেই হয় যে, এই সিরিজ দেখতেই হবে!


যে সিনেমা দেখে আপনাকে হাসতেই হবে
দক্ষিণী এই সিনেমা দেখে ভয় না পেলে…
সমাজের যে কাঠামোকে প্রশ্ন করে ‘লাপাতা লেডিস’
