
শুরুতেই কালো পর্দা। তাতে স্থানু হয়ে থাকতে হলো বেশ কিছু সময়। একসময় মনে হলো—স্ক্রিনে সমস্যা, নাকি সিনেমা চলা প্ল্যাটফর্মে! তখনই কানে বেজে উঠল নানা কিসিমের শব্দ। প্রত্যেকটি শব্দেরই আছে ভিন্ন ভিন্ন দ্যোতনা। সেসব স্ক্রিনে থাকা কালো পর্দাতেও কিছু অদৃশ্য অবয়ব গড়ে তোলে। আর তারপরই হুট করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছবির মতো সুন্দর একটি বাগান, যেখানে মানুষের দেহভস্মের গুণে ফোটে লাল টুকটুকে ফুল!
এমনই এক আবহে শুরু হয় ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’। পরিচালক জোনাথন গ্লেজারের এই সিনেমাটি সমালোচক মহলে বেশ আলোড়ন তুলেছে। গত কান উৎসবে জিতে নিয়েছে দুটি প্রধান পুরস্কারও। ন্যাশনাল বোর্ড অব রিভিউ ঘোষিত ২০২৩ সালের সেরা পাঁচটি আন্তর্জাতিক সিনেমার মধ্যে এটি একটি। বাফটায় তিন পুরস্কার জেতার পর এটি এবারের অস্কার আসরেও ৫টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে। সব মিলিয়ে ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’–এর আগ্রহের জায়গা পুরস্কার, তা মুখ ফুটে না বললেও বোঝা যায়।
২০১৪ সালে প্রকাশিত মার্টিন অ্যামিসের লেখা একটি উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’। নির্মাতারা অবশ্য বলছেন, প্রকাশিত উপন্যাসের সাথে সিনেমার সংযোগ বেশ হালকা। তবে তাই বলে সুতোর সেই হালকা টান অস্বীকারের উপায় নেই।

ছবিটির গল্প এগিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। অশউইৎজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের কমান্ড্যান্ট রুডলফ হস ও তাঁর স্ত্রী–সন্তানদের নিয়ে এগোয় কাহিনি। এখানে বলে রাখা ভালো, রুডলফ হস কিন্তু বাস্তবের চরিত্র। তবে কাহিনি যে পুরোপুরিই বাস্তবিক, সেটি বলা যাবে না। অর্থাৎ, সত্যি ও ফিকশনের মিশেল আছে দারুণভাবেই।
গল্পে দেখা যায়, জার্মান কমান্ডার রুডলফ হস ও তাঁর স্ত্রী এডউইগ এমন একটি বাড়ি বানিয়েছেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের পাশে, যেখানে ক্যাম্পের নিষ্ঠুরতার লেশমাত্র অনুভূত হয় না। রক্তভেজা কাদার পাশেই একটিমাত্র দেয়ালের তফাতে পাওয়া যায় সবুজ ঘাসের চত্বর। সেখানে দেখা যায় নানা রঙ–বেরঙের ফুল, মেলে পুষ্টিকর সবজি। এমনকি চিত্তবিনোদনের জন্য আছে সুইমিং পুলও। অথচ এর কয়েক হাত দূরেই শোনা যায় নির্যাতিতের তারস্বরে চিৎকার। বাতাসে ভেসে তা সুন্দর চত্বরে এলেও তা কারও কানে ঢোকে না, মাথায় তো আরও নয়। তাই রুডলফের বুটে থাকা রক্ত যখন জলে ধোয়া হয়, তখন তা আর রক্ত বলে বোধ হয় না। বরং সবুজ চত্বরের মহিমায় তা স্রেফ লাল রং বলে ভ্রম হয়।

এই সিনেমায় যে সাউন্ড ডিজাইন করা হয়েছে, তা অভিনব তো বটেই, সেই সঙ্গে অনুপমও। আপনি যখন পর্দায় দেখছেন একটি চূড়ান্ত স্বাভাবিক পারিবারিক খাবারদাবারের আয়োজন, ঠিক তখনই চামচ–প্লেটের টুংটাং শব্দের সাথে সাথে আওয়াজ তোলে গুলির ঠুসঠাস। তার সঙ্গে কানে আসে সদ্য মৃতের সর্বশেষ দীর্ঘশ্বাস সংবলিত মৃদু স্বগতোক্তিও। এভাবে হস পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর পাশে বাস করেই অবলীলায় হাসি–আনন্দে দিন যাপন করে যায়। এর ব্যত্যয় রুডলফের স্ত্রী এডউইগের কাছে মৃত্যুর নামান্তর। তাই স্বামীর পদোন্নতিসংক্রান্ত বদলিও তাঁর কাছে বিষবৎ বোধ হয়।
নিষ্ঠুরতা ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’–এর মূল উপজীব্য। এখানে নির্দয়তা এসেছে খুবই সূক্ষভাবে। কখনো জলকেলিরত ক্ষমতাবানদের হাতে ঠেকে পুড়ে যাওয়া মানুষের হাড়ের টুকরা। আবার কখনো অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বলতে একজনকে দিয়ে দেওয়া হয় পুড়িয়ে মারার হুমকি। এভাবেই আনন্দ উদযাপনের সম্মিলনেও প্রধান চরিত্রের মাথায় ঘোরে অংশগ্রহণকারী সবাইকে মেরে ফেলার উপায়ের অনুসন্ধান!
বলতেই হয় যে, এই সিনেমার স্টোরিটেলিং পুরোপুরি ভিন্ন ঘরানার। দৈর্ঘ্য খুব বেশি লম্বা না হওয়ায় বিরক্তিবোধ সৃষ্টির কোনো কারণ নেই। বরং কাহিনির কোনো ভিন্ন উপস্থাপন ধরা দেয় কিনা, সেই আশা মনে আগ্রহ জাগায় বারবার। আর পুরো ছবি দেখে শেষ করার পর তৃপ্তি হয় নতুন কিছু দেখতে পাওয়ার আশাপূরণে। কেবল এই একটি কারণেই আপনি দেখে ফেলতে পারেন ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’। ব্যতিক্রমী কিছু প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা যে হবেই, সেটি নিশ্চিত!


এই পৃথিবীতে ফুলেরা যেভাবে নিহত হয়
বার্বি কি শুধুই গোলাপি দুনিয়ার হাতছানি
ছবি অস্কারে মনোনয়ন পাওয়ায় গৃহবন্দি নেতার মুক্তি
