বুথফেরত গণনায় বাজিমাত বিজয়ের, ক্ষমতার মসনদে বসছেন তামিল সুপারস্টার?

তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। বিভিন্ন জরিপকারী সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের ভোটে দ্রাবিড়ীয় তথা দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। কোনো কোনো সংস্থার জরিপ এম কে স্ট্যালিন নেতৃত্বাধীন ডিএমকে’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে’র টানটান লড়াইয়ের আভাস দেয়। আবার কিছু সংস্থা তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’র (টিভিকে) দাপুটে জয়ের পূর্বাভাসও দিয়েছে, যে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিজয় জোসেফ চন্দ্রশেখর, ভক্তদের কাছে যিনি থালাপতি বিজয় হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। সংস্থাগুলোর মতে, এই সুপারস্টার আবির্ভূত হতে পারেন তামিলনাড়ু নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ‘কিংমেকার’ হিসেবে। 

জেভিসি’র এক্সিট পোল অনুযায়ী, ২৩৪ সদস্যের তামিলনাড়ু বিধানসভায় ১৩১ থেকে ১৫০টি আসন পেতে পারে এনডিএ, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ১১৮-এর অনেক উপরে। অন্যদিকে, এসপিএ জোট পেতে পারে ৮০ থেকে ১০১টি আসন। অন্যান্য দলগুলো পেতে পারে ২ থেকে ৫টি আসন।

তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে এক্সিস মাই ইন্ডিয়া। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিজয়ের টিভিকে নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৯৮ থেকে ১২০টি আসন। এতে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বিজয়ের জোট একদিকে ‘কিংমেকার’, অন্যদিকে সরকার গঠনকারী শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন ত্রিমুখী রূপ নিয়েছে। 

এক্সিস মাই ইন্ডিয়া’র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ও প্রথমবার ভোটারদের বড় সমর্থন পেয়েছে টিভিকে। ফলে অনেক আসনে সরাসরি জয় না পেলেও, বড় প্রভাব ফেলবে দলটি।

এক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষা। ছবি: সংস্থাটির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

বিজয় হতে পারেন ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ 
তামিলনাড়ু রাজ্যে বিজয়ের বিশাল ভক্তসমর্থন রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক আবেদন প্রচলিত জাতিগত বিভাজনকে অতিক্রম করে, যা তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে এমন এক রাজ্যে, যেখানে জাতিগত রাজনীতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা রাজ্যের নানা শ্রেণির ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে, বিশেষ করে শিক্ষিত শ্রেণির ভোটারদের কাছে।

শুধু পরিচিতি নয়, বিজয়ের প্রচারে ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ বার্তা এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা টিভিকে-কে অন্যান্য দ্রাবিড়ীয় দলগুলোর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। তাঁর প্রচারণা মূলত প্রথমবার ভোটার, চাকরিপ্রত্যাশী ও শহুরে মধ্যবিত্তকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

একা লড়াই: শক্তি নাকি দুর্বলতা?
বিধানসভায় এককভাবে টিভিকে’র অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তামিলনাড়ুর নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী জোট ও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। ডিএমকে ও এআইএডিএমকে উভয়েরই দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা সংগঠন রয়েছে, যা ভোটকে বুথ পর্যায়ে রূপান্তর করতে সক্ষম।

এক্সিস মাই ইন্ডিয়ার তামিলনাড়ুর বিধানসভা সমীক্ষা। ছবি: সংস্থাটির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

বর্তমানে একা লড়াই করে টিভিকে-কে সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলতে হচ্ছে। যদিও বিজয়ের সমাবেশে বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে, তবে ভারতের নির্বাচনী বাস্তবতা বলছে, জনসমাগম সবসময় ভোটে রূপ নেয় না। শক্তিশালী তৃণমূল নেটওয়ার্কের অভাব টিভিকে’র জনপ্রিয়তাকে আসনে রূপান্তরে বাধা হতে পারে।

ভোট ভাগের ঝুঁকি ও রাজনৈতিক প্রভাব 
টিভিকে’র মূল সমার্থকগোষ্ঠী তরুণ, শহুরে মধ্যবিত্ত ও রাজনীতিতে অনাগ্রহী নাগরিক, যার সঙ্গে এআইএডিএমকে জোটের ভোটারদের অনেকাংশে মিল রয়েছে। ফলে ভোট ভাগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ঘনিষ্ঠ লড়াইয়ের আসনে ক্ষমতাসীন ডিএমকে’র পক্ষে যেতে পারে।

অন্যদিকে, এআইএডিএমকে’র জন্য বিজয়ের উত্থান সরাসরি হুমকি, বিশেষ করে শহর ও শহরতলিতে। আবার ডিএমকে’র জন্য টিভিকে ভোট ভাগ করে দেওয়ার ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বিজয়ের জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝারি ভোট শেয়ার পেলেও বিজয়ের দল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। তবে ঝুঁকির বিষয় হলো, খারাপ ফল করলে দলটি প্রান্তিক হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তারকাখ্যাতি কি মাঠের বাস্তবতাকে টেক্কা দিতে পারবে?
বিজয়ের টিভিকে’র প্রচারণার মূল বার্তা দুর্নীতিবিরোধিতা, শাসন সংস্কার ও কল্যাণনির্ভর রাজনীতি। তবে ঐতিহাসিকভাবে তামিলনাড়ুর নির্বাচনে ফল নির্ধারিত হয় ন্যারেটিভ, জোট, জাতিগত সমীকরণ ও শক্তিশালী বুথ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে। 

সমালোচকরা বিজয়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, জনপ্রিয়তা দিয়ে শাসন পরিচালনা সম্ভব নয়। তবে বিজয় নিজেকে একটি স্বচ্ছ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন এবং সততা ও প্রশাসনিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

বিজয়ের রাজনৈতিক অভিষেক নিঃসন্দেহে তামিলনাড়ুর নির্বাচনী সংস্কৃতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আসল পরীক্ষা হবে যে, তাঁর সিনেমার জনপ্রিয়তা নির্বাচনী সাফল্যে রূপান্তরিত হতে পারে কি-না? গভীর শিকড়যুক্ত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রভাবিত একটি রাজ্যে, টিভিকে’র কর্মকাণ্ডই বলে দেবে বিজয় একজন প্রকৃত পরিবর্তনকারী, নাকি শুধু সাময়িক এক বিঘ্নকারী!

সূত্র: দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইকোনকিম টাইমস